Categories
Blog

অতি মারি আমাদের কিছু শেখাচ্ছে?

কয়েক মাসেই আমরা কুপোকাত। চেনা পৃথিবী একেবারে ওলটপালট হয়ে গেছে। অনিশ্চয়তা জেঁকে বসেছে মনে। অনেকেই হয়তো ফিরে তাকাতে চাইছি আমাদের ভুলগুলোর দিকে, যা হয়তো আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী করে এসেছি। নিজেদের পুনর্মূল্যায়ন করতে চাইছি। অনেকেই নিজেকে প্রশ্ন করছি, কোনো সামগ্রিক পাপ করে ফেলেছি কিনা।
সত্যিই এই করোনাভাইরাস অতি মারি আমাদের জীবনেকে অন্যরকমভাবে ভাবতে শেখাচ্ছে, যা আমরা আগে কখনও ভাবিনি বা ভাবার প্রয়োজন মনে করিনি। এটি অন্তত আমাদের দেখাচ্ছে, আমরা গেল শতাব্দীগুলোতে কী করেছি এবং কী করা উচিত ছিল, যা করা হয়নি।
প্রথমেই যে বিষয়টি মনে আসে তা হচ্ছে, আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতা, ম্রিয়মাণতা ও নিজেদের ক্ষুদ্রতা ও অসহায়ত্ব। নিজদের, দেশের ও বিশ্বের মানুষকে কেমন করে রক্ষা করতে হবে, তা আমাদের আসলেই জানা নেই। অথচ নিজেদের জ্ঞান নিয়ে আমাদের গর্বের সীমা নেই। স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির যেসব তত্ত্ব আমরা অনুসরণ করি বা করতাম, তার সীমাবদ্ধতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই অতি মারি। দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাগুলো কতটা ভঙ্গুর। সামাজিক নিরাপত্তার নামে আমরা যা করেছি, তা শুধুই লোক দেখানো যেন নেতারা বলতে পারেন, তারা অনেক কিছু করেছেন। তারা কতটুকু করেছেন তা আমরা এখন বুঝতে পারছি।
স্বাস্থ্য খাত যে গহ্বরের মতো অন্ধকার তা বোঝা যাচ্ছে। আমাদের অসহায়ত্ব আমাদেরই অবাক করে দিয়েছে। শুধু এ দেশে নয়, সারাবিশ্বে। ডাক্তার-সেবিকার সংখ্যা অপ্রতুল। হাসপাতালের সংখ্যার কথা বাদই দিলাম। আমরা হাসপাতাল বলে যা চালাই, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। ভাইরাসের আক্রমণের পর নতুন করে সাময়িক হাসপাতাল তৈরি করতে হয়েছে। অনেক ডাক্তার-সেবিকা রোগীর কাছেই যাচ্ছেন না।
আমরা আরও দেখলাম অধর্মের গলাবাজি। একদল বলেছে, ভাইরাস এ দেশে আসবেই না। ওসবে মুসলমানদের কিছু হবে না। আরেক দল আবার জানালেন, আকাশে সুরাইয়া নামে একটি তারা জাগবে এবং সে তারা পৃিথবী থেকে করোনাভাইরাস মুছে দেবে। এরাই যে বিভিন্ন ধরনের ঝাড়ফুঁক দিয়ে সারাদেশের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে রাখেন, তাও বোঝা গেল।
অতি মারি আমাদের কিছুটা চিন্তা করতে শেখাল যে, মানুষ কেমন করে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার চালায়, অন্যান্য জীবকে সন্ত্রাসগ্রস্ত করে রাখে। লকডাউনের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাস্তায় মানুষ ছিল না; তখন সেখানে অনেক পশুপাখির দেখা মিলেছে। সাগরতীরে কাছিম ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী এসেছে, পাখি এসেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে আমরা দেখেছি, সারাবিশ্বে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কতটা কমেছে। পরিবহন না থাকায় বায়ু হয়েছে পরিস্কার ও নির্মল।
আমাদের ব্যবসার বিশ্বায়ন কাজ করেনি। আমাদের দেশ থেকে অনেক দেশই সস্তায় যেসব কর্মী নিয়ে গিয়ে তাদের দেশের উন্নয়ন করে, তারা এখন আর তা করতে চাচ্ছে না। আমাদের কর্মীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। ব্যবসায় অতি মুনাফা লোটার যে চিন্তা আমাদের মাথায় সারাক্ষণ কাজ করেছে, তা ঠিক ছিল কিনা আমরা এখন ভাবছি।
আমরা সবসময়ই সম্পদের অসম বিতরণ নিয়ে কথা বলেছি, টক শো করেছি, গবেষণা করেছি; কিন্তু কাজের কাজ কিছু করিনি। আমাদের সমাজ যে কতটা অসম তা বোধহয় করোনাভাইরাস দেখিয়ে দিচ্ছে। যাদের সম্পদ আছে, তারা চিন্তাহীন জীবের মতো খরচ করেছে, যেন খরচ করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আর যাদের নেই, তারা না খেয়ে থেকেছে, হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে।
কেনাকাটা করার যে অভ্যাস আমাদের মধ্যে স্থিত হয়েছে, তা কি সঠিক ছিল? আমরা কি প্রয়োজনের বেশি কেনাকাটা করিনি? আমরা কি প্রয়েজনের বেশি খাওয়া-দাওয়া করিনি? ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনের বেশি পণ্য কিনতেই আমাদের লোভ দেখিয়েছে। ভাইরাস হয়তো আমাদের সেদিকে নজর দিতে বলছে। বেশিরভাগ মানুষ কিছুই কিনতে পারবে না আর যাদের অর্থ আছে, তারা বেশি বেশি কিনবে। এ ব্যবস্থাটি কতটা ন্যায্য তা চিন্তার সময় দিয়েছে করোনাভাইরাস। দেখা যাক আমরা কিছু শিখতে পারি কিনা।
লকডাউন আমাদের বুঝিয়েছে, আমরা আসলে সামাজিক জীব। আমাদের জীবনে বন্ধু প্রয়োজন, পরিবার প্রয়োজন, মানুষের সাহচর্য প্রয়োজন। আমরা একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারি না। আবার একই সঙ্গে দেখিয়েছে, আমরা কতটা বৈষম্যবাদী। কেউ যখন করোনাক্রান্ত হয়েছে, আমরা তাকে সমাজচ্যুত করেছি। এই আমরাই আবার দলে দলে মিলে গায়ে গায়ে লেগে গ্রামে যাওয়ার জন্য ফেরি পার হয়েছি। এক ধরনের কূটাভাস লক্ষ্য করা গেছে। মৃত্যুচিন্তা আমাদের মন আচ্ছন্ন করেছে। আমরা ভয় পেয়েছি। কেউ যদি বলেন যে ভয় পাননি, তিনি হয়তো মিথ্যা বলছেন।
আমার মনে হয় মৃত্যুচিন্তা একদিক দিয়ে ভালো। মৃত্যু যে এক সময় আমাদের কাছে আসবে, তা বেশিরভাগ মানুষেরই মনে থাকে না। আমরা এমনভাবে জীবনযাপন করি, যেন মনে হয় কোনোদিনই আমাদের মৃত্যু হবে না। মৃত্যুচিন্তার অনুপস্থিতিতে আমাদের অনেক ভুল হয়, মানবতার পথে থেকে আমরা বিচ্যুত হই। মৃত্যুচিন্তা কিছুটা হলেও আমাদের আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। কিছুটা হলেও শুদ্ধ ও ন্যায়ের পথে চালিত করতে পারে।
এই অতি মারি আমাদের তথাকথিত নিরাপত্তার মূলে আঘাত করেছে। যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, আণবিক বোমা কিছুই করোনার বিরুদ্ধে কাজে আসছে না। আসল নিরাপত্তা যে স্বাস্থ্য, খাবার এবং সম্পদের সমতা, তা এই ভাইরাস আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে।
আমরা কেন যুদ্ধ করি? যত না নিজের নিরাপত্তার জন্য, তার চেয়ে বেশি অন্যকে দখল করার জন্য। নিজের নিরাপত্তাই যদি হবে, তাহলে আমাদের অস্ত্রগুলো এখন কাজে আসছে না কেন? ভাইরাস বোঝাচ্ছে যে স্বাস্থ্যই আসল নিরাপত্তা। ভাইরাসের আক্রমণ আসলে আমাদের জন্য একটি সুযোগ নিজেদের পুনর্মূল্যায়ন করার, নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলো যাচাই করার। আমরা মানুষ হয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছি, আমাদের গ্রহের প্রতি কেমন ব্যবহার করছি। আমাদের যদি সভ্যতা হিসেবে বাঁচতেই হয়, তাহলে কেমন করে বাঁচা উচিত? নিজেদের শুধরানোর কোনো সুযোগ আছে কিনা, এখন আমরা কেন এত অসহায়- এসব নিশ্চয়ই সবাইকে ভাবাচ্ছে।
মানুষকে দেখে এখন বেশ অসহায়ই মনে হচ্ছে।

প্রথম প্রকাশঃ সমকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *