Photo - ChatGPT

আদি একাকিত্ব

।। ঈশ্বর ও ইয়ন ।।
শূন্যতাটা একেবারেই অতিপ্রাকৃত। এখানে অসহনীয় নীরবতা সদা সঙ্গী। এই নীরবতায় ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টির বিস্তার নিয়ে ভাবতে ভাবতে, তারা ও নীহারিকাদের মহাজাগতিক নাচ দেখতে দেখতে এক অদ্ভুত একাকিত্বের যন্ত্রণা অনুভব করলেন।
‘এটা এত নীরব হতে হবে কেন?’ তিনি সশব্দে ভাবলেন। ভাবনার শব্দগুলোও শূন্যতায় মিলিয়ে গেল।
নিজের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি তারার মালা থেকে টান দিয়ে একটা প্রাণী সৃষ্টি করলেন। মানুষ নয়। মানুষেরা নিচের পৃথিবীতে আছে, ওরা তাঁর একাকিত্ব ঘোঁচাতে পারেনি। এমন এক প্রাণী তৈরি করলেন যে সৃষ্টির অর্থ বুঝতে পারে। তিনি এই প্রাণীর নাম দিলেন ইয়ন। ইয়নের চেহারা হাজার ছায়াপথের আলোর মতো ঝলমল করছে, তার চোখে ভেতর উচ্চ-মহাজাগতিক জ্ঞানের গভীর এক সাগর।
‘এসো ইয়ন, এসো; এসো কথা বলি’। ঈশ্বরের চোখে-মুখে আনন্দের উজ্জ্বলতা।
ঈশ্বরের অভিবাদনে ইয়নের চেহারায় তেমন পরিবর্তন দেখা গেল না।
‘অনেক ধন্যবাদ, স্রষ্টা; এখন বলুন আমাকে কেন তৈরি করলেন।’ ইয়নের কণ্ঠে মহাবিশ্বের গুঞ্জন।
ঈশ্বর উত্তর দিলেন– ‘চারদিকে তাকিয়ে দেখো; কী অদ্ভুত সব সৃষ্টি; এইসব সৃষ্টি নিয়ে আলাপ করে, ভাবনা ভাগাভাগি করে নিতেই তোমায় তৈরি করেছি। তাছাড়া আমার নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে যে একাকিত্ব মিশে আছে তাও কিছুটা লাঘব হতে পারে।’ ঈশ্বর ব্যাখ্যা দিলেন।
লক্ষ-কোটি বছর ধরে ইয়নের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে গেলেন ঈশ্বর। ইয়নও বেশ কৌতূহলী; সে তারা, গ্রহ আর মানুষের জীবন নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন করলো।
শেষে জানতে চাইলো– ‘কিন্তু ঈশ্বর, শুধুই আপনার সঙ্গী হওয়া ছাড়া আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?’
ঈশ্বর একটু থমকে গেলেন। তিনি কয়েক লক্ষ বছর ধরে চিন্তা করে জানালেন– ‘তোমার জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে তুমি যেমন আছো তেমনি থাকা আর আমার অস্তিত্ব বজায় রেখে আমার সৃষ্টির দুঃখ এবং আনন্দ বুঝে তা আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া।’
ইয়ন হেসে ফেলে। বলে– ‘কিন্তু শুধুই সঙ্গ দিয়ে কি আপনার অস্তিত্বকে পূর্ণ করতে পারবো?’
ঈশ্বর এবার গভীর চিন্তায় পড়লেন। এই নবজাত সৃষ্টি এমন করে ভাবতে শিখলো কেমন করে? তিনি বললেন– ‘হয়তো কোনো উদ্দেশ্যের জন্যে নয়; একসঙ্গে থাকাটাই আমাদের অস্তিত্ব, একাকিত্ব থেকে মুক্তি, সান্ত্বনা।’
এভাবেই ঈশ্বর ও ইয়ন তাদের অন্তহীন কথোপকথন চালিয়ে গেল।

।। সময় ।।
ভোরের স্নিগ্ধ, আধো-উজ্জ্বল আলোতে ঈশ্বর নেমে এলেন। একটি সাধারণ রূপে, একজন মধ্যবয়স্ক মানুষের বেশে; যার চোখগুলো ক্লান্ত কিন্তু জীবনের প্রতি তার কৌতূহল এখনও হারায়নি। এসেই এক শহুরে স্পন্দন টের পেলেন তিনি। পঁক-পঁক, পিক-পিক হর্ন বাজিয়ে ছুটছে গাড়ি, রিকশার ক্রিং-ক্রিং, গল-গল করে মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে, কেউ রাস্তায় থুথু ফেলছে, অনেকে অনেকের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে, শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে, দোকানপাট খোলার শব্দ হচ্ছে, আবর্জনার দুর্গন্ধ ও ডিম-পরোটার বাসনা কোথা থেকে যেন উড়ে আসে, চায়ের দোকান থেকে হাসিগুলো একটা ছন্দময় সিম্ফনির মতো শোনায়।
এই ছন্দের কথা ঈশ্বর জানেন, তবে তা দূর থেকে জানেন; তাঁর কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়। মর্ত্যের মানুষের মতো আচরণ করার চেষ্টা করেন ঈশ্বর। একজন পথচারীকে জিজ্ঞাসা করলেন– ‘ভাই, আপনার একটু সময় হবে?’
লোকটি তাঁর দিকে না তাকিয়ে তাঁর ঘড়িতে এক নজর চাইলো। তারপর বেশ অবাক চোখে বললো– ‘হ্যাঁ হবে, সবে তো সাতটা পেরিয়েছে। কিন্তু আপনি কে? এখানে নতুন এসেছেন? আপনি এত ধীরে হাঁটছেন কেন?’
‘আমায় নতুনই বলতে পারেন’– ঈশ্বর উত্তর দিলেন। বাতাস থেকে একটা হাসি এসে তাঁর ঠোট ছুঁয়ে যায়। তিনি আর কথা বাড়ান না।
তিনি হাঁটা শুরু করেন, ঘুরে বেড়ান, প্রতিটি মুহূর্ত মনে শুষে নিতে চান। তাঁর চেহারায় সূর্যের উষ্ণতা, রাস্তা কিনারের খাবার রান্নার গন্ধ তাঁর ইন্দ্রিয়কে উত্তেজিত করে। প্রতি মুহূর্তের অভিজ্ঞতাই তাঁর কাছে ভালো লাগে, যেন মুহূর্তগুলো তাঁর নিবাস এবং তাঁর সৃষ্টিকে দেখার মাঝে সেতু তৈরি করে।
একটা পার্কে গিয়ে বেঞ্চে এক বৃদ্ধা মহিলার পাশে বসে পড়েন তিনি। বৃদ্ধা পাখিদের দিকে খাবার ছুড়ে দিচ্ছিলেন। অনেক পাখি; অনেকগুলো কাকও দেখলেন তিনি। দু-একটা কাক তাঁর দিকে তাকালোও।
একটু নিচু কণ্ঠে ঈশ্বর বৃদ্ধার কাছে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা আপা, আপনি কি কখনও একাকিত্বে ভোগেন’– ঈশ্বরের দিকে না তাকিয়েই বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, ‘সবসময়’। তার চোখে লক্ষ বছরের একাকিত্বের প্রতিচ্ছবি। ‘কিন্তু আপনি কোথা থেকে এসেছেন ভাই যে একাকিত্ব বোঝেন না? তবে এই ছোট্ট প্রাণীগুলো আমাকে সঙ্গ দেয়। একা বোধ করলে আপনি কী করেন? নিন, আসুন, ওদের খাবার দিন; ভালো লাগবে।’
বৃদ্ধার প্রশ্নটা ঈশ্বরের বুকে আঁচড় কেটে দেয়। তিনি চিন্তা করেন। দৈব একাকিত্বের ভার আরও বেড়ে যায়। ‘আমার একাকিত্ব আপনার কল্পনার চেয়েও বেশি।’
বৃদ্ধা তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসেন। সামান্য হলেও সেই হাসিতে তাচ্ছিল্যের ভাব লক্ষ্য করেন ঈশ্বর। নিজেকে ছোট মনে হয়। তারপরও এই বৃদ্ধাকে তাঁর ভালো লাগে। এই মানুষটা যা পারে, তিনি তা পারেন না। সন্ধ্যা-অব্দি তিনি সেখানেই বসে কাটান। অনেক মানুষের আনাগোনা দেখেন। তার অনেক আগে বৃদ্ধা তাঁর বাড়ি ফিরে গেছেন।
সূর্য দিগন্তের ওপারে চলে গেলে ঈশ্বর বৃদ্ধার বাড়িতে যান। দেখেন বৃদ্ধা না খেয়েই শুয়ে পড়েছেন, ঘুমুচ্ছেন; কিন্তু ঘুমের মাঝেই তাঁর ডান হাতে ধরা পাখাটা ঘুরছে। চারপাশে বড্ড গরম পড়েছে। রাতের গরম বাতাস থেকে একটা হাসি এসে ঈশ্বরের ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়।
বৃদ্ধার বাড়ি থেকে বেরিয়েই রাস্তার ওপারে একটা ছোট্ট ক্যাফে দেখতে পান তিনি। ঈশ্বর সেখানে ঢুকে পড়েন। চারপাশের কণ্ঠস্বরের গুন-গুন, হুম-হুম, হাম-হাম শব্দ তাঁর মনকে একটা আরামদায়ক চাদরে লেপটে দেয়।
এক তরুণী এগিয়ে এসে, চেহারায় আন্তরিক হাসি নিয়ে জানতে চাইলো– ‘স্যার, আপনি কী খাবেন’
‘শুধু একটা কফি’– তিনি হেসে জবাব দেন। ‘এবং হয়তো তোমার কিছুটা সময়। একটু বসো না।’
মেয়েটি ঘুরে এসে বসে, কেন বসে তা সে নিজেও জানে না, সংক্ষিপ্ত কথা হয়। তারপর মেয়েটা তার নিজের কাজে মন দেয়।
সেই রাতে যখন ঈশ্বর ওপরে ফিরে যান, তারাগুলো তাঁর কাছে কম দূরের মনে হয়, মহাবিশ্ব কম প্রকাণ্ড মনে হয়, নিজেকে কম একাকী মনে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *