Photo: Google

মতিউল নওশাদ ভাই প্রায় পাঁচ বছর আগে আমায় তার বাবার এক উপদেশের গল্প শুনিয়েছিলেন। তার বাবা সাপ্তাহিক ছুটির দিন কতটা সুন্দর করে কাটানো যায় তা নিয়ে তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘সারা সপ্তাহ কাজ কর অন্যের জন্যে; সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি তোমার; এই দিনটিকে যতটা পার লম্বা করবে; তোমার যা করতে ভাল লাগে, তাই করবে।‘
নওশাদ ভাইয়ে এই কথা আমার এতই মনে ধরেছিল যে সাপ্তাহিক ছুটির দিন – শুক্রবারে আমি ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠা শুরু করলাম। কয়েক শুক্রবার ভোরে ওঠার পর দেখি অন্যান্য দিনেও ঘুম ভেঙ্গে যায় ঠিক সে’সময়েই। আপিসে পৌঁছুতে হয় সাড়ে-আটটায়। তাহলে পাঁচটায় উঠে যদি সাড়ে-পাঁচটা থেকে বই পড়া শুরু করলে যদি সাড়ে-সাতটা পর্যন্ত পড়া যায়, তাহলে জমজমাট দু’ঘন্টা পড়া হয়ে যায়। টপাটপ বই শেষ হতে শুরু করলো। যেসব গল্প-উপন্যাস কিনে রেখেছিলাম কিন্তু পড়া হয়ে ওঠেনি, তাও পড়া হয়ে গেল।
আমি এমনিতে অলস মানুষ। বই পড়া এবং মাঝে-মাঝে এটা-ওটা লেখা ছাড়া আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না।
তবে গেল ছয় বছর ধরে ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকায় একটি নিয়মিত কলাম লেখি। ইংরেজীতে। ঢাকা ট্রিবিউন আমায় যত ভালবাসে, আর কোন পত্রিকাকে আমার লেখার এতো মূল্য দিতে দেখিনি।
আমার লেখা ছাপা হয় শনিবারের কাগজে। আদতে লেখাটি ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদকীয় বিভাগে পাঠিয়ে দেয়া উচিৎ বিষ্যুদবারেই। তা না করে আমি তাদের লেখা পাঠাই শুক্রবার সকালে। তারা আমার অলসতা ক্ষমা করে দিয়েই এত বছর চালিয়ে এসেছেন। এখনও তাই। আজ সকালেও পাঠিয়েছি।
লেখা পাঠিয়ে চলে যাই আমার লেখা টেবিলের পেছনে জানালার পাশে। একটি ডিভানের মত আছে। আসলে সোফা। বালিশ এলিয়ে দিয়ে শোয়াও যায়। জানালা দিয়ে তখন সূর্যালোক প্রবেশ করে। যে বইটি পড়ছিলাম, তা আবার নিয়ে বসি। হয়’তো আধ-ঘন্টা। সকালের ওষুধ এবং নাস্তা খাওয়ার সময় হয়ে যায়। তা করতে-করতে প্রায় ন’টা বাজে – এবং বাজারে যাওয়ার সময় হয়ে যায়।
ততক্ষনে বাড়িতে ছ’টি খবরের কাগজ চলে এসেছে। শুক্রবার ছ’টি আসে তাদের সাহিত্যপাতা আছে বলে। কাগজগুলো থেকে সাহিত্যপাতা আলাদা করে রেখে বেরিয়ে যাই।
প্রথম গন্তব্য বনানী কবরস্তান। সেখানে বাবা, মা, শ্বশুর, চাচা, চাচী ও ভাই আছেন। দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে মনে করি। মৃতদের জন্যে দোয়া করার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।
বাজার-সদাই করে প্রথম কাজ সাহিত্যপাতাগুলো নিয়ে বসা। পাতাগুলোতে প্রতি সপ্তাহে অন্ততঃ আটটি ছোটগল্প থাকে সমসাময়িক লেখকদের।
এখন কাগজগুলো আসে না। মানা করে দিয়েছি ভাইরাসের ভয়ে। তাদের সাহিত্যপাতাও নেই। বিকেলে ক্লাবের ব্যায়ামাগারে যাওয়া নেই। ক্লাবই বন্ধ। সব বন্ধ। বাজারে যাওয়া, কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া – সব। সব এখন দূর থেকে।
তবে জানালা আছে। সূর্যালোক আছে। লেখা আছে। বইও আছে। শুক্রবার আমার ছোটগল্প পড়ার দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

Why do we keep waiting for the next disaster?

Five patients died at a five-star hospital when a makeshift ward caught fire on Wednesday …