ঈদের শাড়ি

আপিসে সহকর্মীদের কথার ঝাঁঝে কামরুল সবসময়ই ভীত থাকে। সহকর্মীরা বন্ধুদের মত নয়; বন্ধুদের জ্বালাতনে ঝাঁঝ থাকে না, সহকর্মীদের থাকে। কামরুল যত পারে কম কথা বলে আপিসে, যত পারে কম আড্ডা দেয়। আপিসে আড্ডা মানেই ঝাঁঝ, এমনই ঝাঁঝ যে রাতে মাঝে-মাঝে ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটায়।

সারাদিন আপিস করে বাড়ি ফেরার আয়োজন করতে-করতে কামরুলে মনে হয়, যাক! আজ কোন সহকর্মী তাকে ঝাঁঝালো কিছু বলেন নি। নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে পারছে আজ। যাওয়ার পথে কেউ না থামালেই বেঁচে যায়। শান্তিতে বেরিয়ে যেতে পারে। উঠে দাঁড়িয়েই চোখাচোখি হয়ে গেল ইব্রাহীম সাহেবের সাথে। এম শ্যেন-দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেন আগে থেকে তৈরী হয়েই ছিলেন। পিলে চমকে গেল তার চাউনি দেখে।

‘কি কামরুল ভাই, চললেন?’ ইব্রাহীম সাহেবের প্রথম প্রশ্ন।

‘জ্বী ইব্রাহীম ভাই, চলি।‘

‘আরে ভাই, শুনেছেন নাকি? আপনার বন্ধু ফাইয়াজ ভাই’তো বাজীমাৎ করে দিয়েছে! কিযে সব বন্ধু-বান্ধব লালন করেন, আপনি।’

কামরুলের মনে হলো গোলাগুলির ভেতর পড়ে গেছে। অন্যান্য দিন এদের বাণ তার দিকে তাক করা থাকে তার নিজের কোন ব্যাপারে। আজ তার বন্ধুকে নিয়ে কথা উঠতেই কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না।

‘কি, কি করেছে সে?’ কম্পিত কন্ঠে জানতে চাইলো।

‘আরে আর বইলেন না; ঐ যে, তার চ্যানেলে দুই নামকরা প্রেজেন্টার আছে না; কি যেন নাম, হ্যা, রীয়া আর সুস্মিতা! ওদের দু’জনকে ঈদের শাড়ি কিনে দিয়েছে আপনার বন্ধু; এই বয়েসে কি যে ভিমরতি হয় মানুষের! কোন দুনিয়া যে আইলো, ভাই…’।

বন্ধুর নামে এ কথা শুনে কামরুলের কান গরম হয়ে গেল। মেজাজও। টেলিভিশনের প্রেজেন্টারকে শাড়ি কিনে দেয়াটা সবাই খুব ভাল চোখে দেখবে না। সে কি আসলেই দিয়েছে শাড়ি? নাকি কোন কথা হয়েছে শাড়ি নিয়ে, সেটিকেই কেউ কিনে দেয়ার কথা বানিয়ে দিয়েছে? নাহ্; ব্যাপারটি ভাল করে জানতে হবে। ওদের আপিসের গসিপ্ এখানেও পাড়ি দিয়েছে, তাহলে নিশ্চয়ই আরো অনেক আপিসে গেছে। সেখানেও ইব্রাহীমের মত মানুষেরা এ গল্প নিয়ে কানাঘুঁষা করছে।

‘বুচ্ছেন ভাই; একেই বলে মিড্-লাইফ ক্রাইসিস্; আপনার বন্ধুর শুইতে ইচ্ছা হইসে। যাক, আপনি আর কি করবেন।’

‘আপনি কোথা থেকে জানলেন, ভাই? কে বলেছে’?

‘কে আর; ওনাদের চ্যানেলেরই তন্বী রহমান বলেছে; শাড়ি দেয়ার সময় তন্বী সেখানেই ছিল! কেমন অসভ্য ভেবে দেখেছেন! আরে করবি তো এসব আড়ালে-আবডালে কর!’

‘আচ্ছা, আমি ওকে জিজ্ঞেস করে দেখবো।‘ এই বলে বেরিয়ে এলো কামরুল।

ইচ্ছে ছিল ফেরার পথে কয়েকটা দোকানে থেমে ঈদের কিছু কেনাকাটা করবে। মনটা বিষিয়ে গেছে; আর দোকানে যেতে ইচ্ছে করলো না। বাড়ি ফিরে গেলো। কেনাকাটা করে নি শুনেও তার বৌ কিছু বললো না। পোষাক ছেড়ে ছেলেমেয়েদের খোঁজ নিলো কে শহরের কোন প্রান্তে আছে এবং কখন বাড়ি ফিরবে। টেলিভিশন দেখলো। রাতে খাবার সময় স্ত্রী তাকে চুপচাপ দেখে জানতে চাইলো তার কি হয়েছে। রানুকে প্রায় বলেই ফেলেছিল কি হয়েছে। কি মনে করে নিজেকে সামলালো। রাতের খাবারের পর ভেবেছিল রানুকে নিয়ে দোকানে বেরুবে। তাও ইচ্ছে করলো না।

ফাইয়াজকে ফোন করবে? কি জানতে চাইবে সে? কেমন করে জানতে চাইবে? এমন কথা কি জানতে চাওয়া যায়? সত্যিই যদি তার শাড়ি উপহার দেয়ার পেছনে কোন ফন্দি থাকে? ফাইয়াজের সাথে শেষ কথা হয়েছে চার-পাঁচ দিন আগে। দু’জনে মিলে একটা কিছু, একটা অনলাইন পোর্টাল দিতে পারে কিনা তা নিয়ে আলাপ হয়েছে। সে সুত্র ধরে আবারও কথা বলতে পারে কামরুল। তারপর জানতে চাইবে ঈদের শাড়ি দেয়ার কথা।

কিছুক্ষণ ইতস্ততির পর মোবাইল হাতে নিয়ে ফোন করলো। অনলাইন পোর্টাল কিছু কথা হলো। তারপর জানতে চাইলোঃ

‘ফাইয়াজ, একটা প্রশ্ন করতে চাই তোমাকে। বাজে প্রশ্ন; তুমি কিছু মনে করবে না তো?’

‘বলো না; কবে কি মনে করেছি তোমার কথায়?’

‘না, মানে…।‘

‘সিরিয়াস মনে হচ্ছে; বলেই ফেলো; শুনতেই হবে আমার।‘

‘আচ্ছা, তুমি তোমার আপিসে দুই প্রেজেন্টারকে ঈদের শাড়ি উপহার দিয়েছো? আমাদের আপিসের ইব্রাহীম সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে। আমার ভাল লাগে নি। তাই তোমায় জিজ্ঞেস করছি।‘

‘ইব্রাহীমকে কে বলেছে তা জানিয়েছে?’

‘হ্যা, তোমাদের রিপোর্টার তন্বী জানিয়েছে তাকে; সে নাকি সেখানেই ছিল তুমি যখন শাড়ি দিচ্ছিলে।‘

ফাইয়াজ জোরে হেসে উঠলো। বললোঃ ‘তুমি বিশ্বাস করেছো?‘

‘বিশ্বাস করলে তো তোমায় ফোন দিতাম না।‘

‘তুমি কাল গিয়ে ইব্রাহীমের কাছে জানতে চেয় যে আমি যে শাড়ি তন্বীকেও দিয়েছি তন্বী সে কথা তাকে বলে নি?’

‘কি!?’

‘হ্যা, আমাদের নিউজরুমে সাতজন মেয়ে আছে; সবাই এসে আমার কাছে ঈদের শাড়ি চাইলো। ওদের কথা দিয়েছিলাম সবাইকে শাড়ি কিনে দেবো; আজ দিয়েছি; তন্বীকে সবার আগে দিয়েছি।‘

[শেষ]

One Reply to “ঈদের শাড়ি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *