Photo - Kalbela

ঈর্ষা

দুজনই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তাও বুঝতে পারছে না। তবে আগে যেখানে ছিল সেখানে নয়। এই প্রান্তর নতুন। এ তারা চেনে না। তবে একে অন্যের উপস্থিতি দুজনই টের পাচ্ছে। আদমের গায়ের উষ্ণতা হাওয়ার গায়ে উড়ে আসে। হাওয়া সেই উষ্ণতা অনুসরণ করে অন্ধকারের মধ্যেই আদমের দিকে তার ডান হাত বাড়ায়। সে আদমের বাম হাতটা ধরে ফেলতে পারে। আদম একটু আড়ষ্ট বোধ করে সরে যেতে চায়। হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার ভাব দেখায়। হাওয়া তার হাত আরও শক্ত করে ধরে। আদম এবার হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে না, তবে হাওয়া বুঝতে পারে আদম রেগে আছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের অদূরে একটা আলো দেখা যায়। দুজনই সেদিকে তাকায়। একটা সুড়ঙ্গের মতো দেখায়। তার ওপারে আলো। সেই আলোতে তাদের দুজনের চেহারাও কিছুটা দেখা যায়। হাওয়া আদমের হাত ছাড়ে না। কোনো এক অজানা আশায়, দুজনই ধীরে ধীরে সেই আলোর দিকে এগিয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে এটা একটা গুহা এবং সুড়ঙ্গের ওপারে পৌঁছে তারা আলোকময় একটা দিনের কাছে উপস্থিত হয়। চোখে লাগে। বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরিয়ে যায় আলোতে ধাতস্থ হতে।
দুজনই যখন স্বাভাবিক হয়, আদম চারপাশের কোনো দিকে না তাকিয়েই তার হাতটা জোরে ছাড়িয়ে নিয়ে হাওয়ার দিকে একটা হুংকার ছুড়ে দেয়—‘তোমার জন্যই আজ আমার এই অবস্থা, এই নির্বাসন। তোমার কথা শুনে ফলটা খেয়েই এ শাস্তিটা পেতে হলো। তুমি যাও, দূরে চলে যাও, আমার ত্রিসীমানায় থেকো না।’
‘আদম, চারদিকে দেখো; একটু বোঝার চেষ্টা করো; ঈশ্বর আমাদের শাস্তি দেননি’—হাওয়া আদমকে শান্ত করার চেষ্টা করে।

আদম আরও রেগে যায়। বলে, ‘তুমি কী বলার চেষ্টা করছ? সাপের কথা শুনে আমাকে ফল খাইয়েছ আর এখন বলছ এ জায়গাটা দেখতে! আমি এখানে থাকতে চাই না, আমি আত্মহত্যা করব; তুমি একাই থাকো এখানে, সরে যাও আমার কাছ থেকে।’

হাওয়া আবার বলে, ‘আদম, তুমি শান্ত হও। আমি তোমাকে বোঝাচ্ছি ঈশ্বরের ইচ্ছেমতোই আমরা এখানে এসেছি।’

ঈশ্বর কাছেই ছিলেন, তিনি যেমনটা থাকেন। হাওয়ার কথা শুনে তার প্রাণ জুড়িয়ে গেল। তিনি তার মন আরও গভীরভাবে পাতলেন; ওদের প্রতি তার ভালোবাসা আরও গভীর হলো।

আদম জানতে চায়—‘তোমার কেন মনে হলো যে তিনি চেয়েছিলেন আমরা, মানে বিশেষ করে আমি, ফলটা খাই?’

হাওয়া স্মিত হেসে বলে, ‘আদম ঈশ্বর যখন আমাদের ফল খেতে মানা করেছিলেন, তখন তোমার বয়স ছিল নয় ঘণ্টা। তুমি এখন যা জানো তার কিছুই তখন জানতে না। তোমার মনে শুধুই স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা। তুমি ছিলে অতি-শুদ্ধ; ঈশ্বর যা আদেশ করবেন, তোমার তাই-ই করার কথা। আমি তোমাকে খেতে বলতে পারি, কিন্তু তুমি তা করলে কেন? ঈশ্বরকে অমান্য করলে কেন? তার অর্থ কি এই-ই নয় যে, তাকে অমান্য করার জ্ঞান তোমার ও আমার মধ্যে আগে থেকেই ছিল এবং তিনিই তা দিয়েছিলেন?’

ঈশ্বর আরও বেশি আগ্রহী হলেন, নিজের সৃষ্টিকে ঘিরে তার মন শান্তিতে ভরে উঠল।

হাওয়া আদমের কাছে এসে আবারও বলল, ‘শোনো, তিনি আসলে চেয়েছিলেন আমরা ফলটা খাই; না হলে তিনি আমাদের এখানে পাঠাতে পারতেন না।’

আদমের চেহারা দেখে বোঝা যায় যে সে হাওয়ার কথা মেনে নিতে পারছে না; বিষণ্ন দৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।

ঈশ্বর এবার কথা বলে ওঠেন। বলেন, ‘হাওয়া, তুমি এসব বুঝলে কী করে? আমি বেশ অবাক হচ্ছি!’

তার কণ্ঠ শুনে দুজনই একটু অপ্রস্তুত হয়। হাওয়া একটু বেশি হয়। বলে, ‘আপনি আমাদের কথা শুনেছিলেন; আপনি এখানেই আছেন?’

একটু সামলে নিয়ে হাওয়া উত্তর দেয়, ‘আমাদের যেই জ্ঞান এখন আছে তা হয়তো সাপটার আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ফল খাওয়ার আগে তো আমাদের তা ছিল না, আমরা তেমনি শুদ্ধ ছিলাম যেমনটা আপনি তৈরি করেছিলেন। সেই চৈতন্যে আমরা আপনি ছাড়া আর কাউকেই চিনতাম না, বুঝতাম না। সাপ আমাকে যতই প্রলুব্ধ করুক, আপনার আদেশ ওই পরিস্থিতিতে অমান্য করা সম্ভব ছিল না। তাহলে এটা কেমন করে সম্ভব হলো? নিশ্চয়ই কোনো না কোনো রূপে আপনি আপনার আদেশ অমান্য করার চেতন আমাদের মধ্যে দিয়েছিলেন। কিছু ভুল বলে থাকলে ক্ষমা করবেন, প্রভু।’

কথা শেষ করে হাওয়া একটু শঙ্কিত মনে অপেক্ষা করে। তবে হাওয়া দেখতে পায় না যে তাদের স্রষ্টা তার দিকে মন্ত্রমুগ্ধ মনে তাকিয়ে আছেন।

ঈশ্বর এবার আদমের উদ্দেশে বলে ওঠেন—‘আদম, তোমার মানুষটাকে ভালো করে দেখো, ওকে বোঝো; তুমি আমার প্রথম সৃষ্টি হতে পারো, কিন্তু মনে হচ্ছে মানবের দ্বিতীয় সংস্করণ আরও সুন্দর হয়েছে, আরও বুদ্ধিমান হয়েছে; একসঙ্গে থেকো, ওকে বুঝে চলো।’

কথা শেষ করে তিনি দুজনের উদ্দেশেই বললেন, ‘যাও, এবার বেরিয়ে পড়ো, এ দুনিয়াটাকে সুন্দর করে গোছাও, একসঙ্গে সন্তানসন্ততি সবাইকে নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাও।’

আদমকে এবার আর বিষণ্ন মনে হয় না। হাওয়াকে নিয়ে ঈশ্বরের প্রশংসা তার মনে তীব্র ঈর্ষার জন্ম দিয়েছে। সে ভাবে—‘এমনই যদি হয় তাহলে হাওয়াকে শাসন করতে আমার অন্য কৌশলের কথা ভাবতে হবে।’

সে শুধু বলে, ‘জি, প্রভু।’
প্রথম প্রকাশ – কালান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *