Photo: Kaler Kheya/Samakal

বাবা যেদিন বাড়ি এসে তোমার মাকে জানালেন যে তিনি তার পীর সাহেবের খানকা-শরিফের গোরস্তানে তাদের দু’জনের জন্য কবর কিনেছেন, সে দিনই চিন্তাটি তোমার মাথায় এসেছিল। হয়তো তু আরও আগেই এ নিয়ে ভেবেছিলে, তবে সেদিন চিন্তার পরিস্ম্ফুটন ঘটেছিল হয়তো। তোমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই তুমি তোমার জন্মদাতা-দাত্রীকে একসাথে হাসি-খুশি শান্তিঘন ভালোবাসা-সিক্ত পরিবেশে দেখতে চাইতে। তাদের মন ভালো থাকলে তোমার মনও খুশি থাকত; দৌড়ে গিয়ে তাদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইতে। হয়তো তুমি তা করতেও, তবে তা তোমার জ্ঞান ফোটার অনেক আগেকার ঘটনা। সেই ভালোবাসার ঝাঁপাঝাঁপি তোমার মনে নেই। তোমার বাবা যেদিন কবর কিনে বাড়ি ফিরেছিলেন তুমি তখন তোমার জীবনের পনেরো বছর পার করেছ। কবর নিয়ে তেমন চিন্তা না করলেও তাদের দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে এই পুরো পনেরো বছর তুমি অনেক ভেবেছ। পাঁচ বছর বয়সে যেদিন প্রথম দেখলে তোমার বাবা তোমার মা’র মুখে আঘাত করলেন এবং মার মুখ থেকে রক্ত ছুটে বেরুল, তুমি সেদিন কিছু বুঝতেই পারনি। তারপর আরও কয়েকবার যখন একই ঘটনা দেখলে, বুঝলে, তোমার বাবা-মা’র জীবন কলহপূর্ণ, অতি-সংঘাতময়। তার অনেক আগেই তোমার পিঠাপিঠি ভাইয়ের জন্ম হয়েছে। বাবা-মা যখন যুদ্ধ করছেন, কেন যেন তুমি চাইতে তোমার ছোট্ট ভাইটি তাদেরকে যেন না দেখতে পায়। তুমি তাকে গল্প শোনাতে। ছেলে-ভোলানো গল্প। এই জ্ঞান তোমার মনে কোথা থেকে উদয় হয়েছিল, তা তুমি এখনও বোঝ না। কী গল্প শোনাতে তা এখন মনে নেই, তবে শোনাতে। গল্পগুলো কোথা থেকে শিখেছিলে, তাও মনে নেই। তারও দু’বছর পর তোমাদের সাথে যোগ দিল এক বোন। তোমার গল্পের ঝুড়ি আরও বড় হলো। সেই ঝুড়ি নিয়ে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় তুমি তোমার ভাইবোনকে নিয়ে বাড়ির পেছন দিকে ছোট্ট একটি বাগানে চলে যেতে। তুমি তখন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ পড়ে ফেলেছ। তোমার মা-ই বইটি কিনে এনে তোমায় পড়িয়েছিলেন। তোমার ভাইবোনকে তাই-ই শোনাতে। ওরা তোমাদের বাবা-মার দ্বন্দ্বের শব্দ পেত না। হয়তো পেত, তুমি বুঝতে না। কিন্তু তুমি জানতে, তাদের কলহ চলছেই।
বাবা যখন কবর কেনার কথা তোমার মাকে জানালেন, তুমি তাকে রেগে অঙ্গার হতে দেখলে। মায়ের মুখ থেকে গালির তুবড়ি ছুটল। তুমি সেই গালিগুলো অনেক আগেই শিখে ফেলেছিলে। গালিগুলোর অর্থও তুমি জানতে। মা তোমার বাবাকে অশ্রাব্য গালি দিচ্ছেন, তা তুমিও সহ্য করতে পারতে না। তুমি আবারও ভাইবোনকে নিয়ে বাড়ির অন্যদিকে সরে যেতে চাইলে। কিন্তু বাবাকে তেড়ে আসতে দেখেই তুমি বুঝে গেলে কী ঘটতে চলেছে। তুমি জানো যে, বাবা মায়ের গায়ে হাত তুললে কী ঘটে। তবে এই পনেরো বছরেই তুমি বাবার চেয়ে অনেক সমর্থ ও লম্ব্বা হয়েছ। বাবার পথে দাঁড়িয়ে দু’হাত উঁচিয়ে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে মাকে আড়াল করে তাকে বুঝিয়ে দিলে- তিনি তোমাদের মাকে আর মারধর করতে পারবেন না। তুমি বড় হয়েছ এবং মায়ের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখ। তোমার পাশে তোমার ভাইও এসে দাঁড়িয়েছিল। বোনটি দূরে বসে দেখছিল। বাবা থমকে গেলেন। তাদের প্রথম সন্তান সমর্থ হয়েছে, তিনি খেয়ালও করেননি। মা মারের হাত থেকে সেদিন বেঁচে গেলেন।
সেদিনই তুমি মনে মনে ঠিক করলে, এই দু’জনের দু’কবরে থাকা উচিত নয়; তাদের গোর একই গর্তে হওয়া প্রয়োজন। অন্তত তুমি তা-ই দেখতে চাও। মাঝে-মাঝেই মনে হয়, এই মানুষ দু’জন তোমাদের জীবনে না থাকলেই ভালো; সবাই ভালো থাকবে- তারাও, তোমরাও। তবে তারা যেহেতু তোমাদের জীবনে চলেই এসেছেন, তুমি চাইতে জীবনে যারা এক হতে পারেননি, মরণে যেন এক সাথে থাকতে পারেন। এ ছিল তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধ। কিন্তু তুমিই বা কে তাদের শেষ ইচ্ছে অমান্য করার? হতে পার তুমি তাদের সন্তান, প্রথম সন্তান; এবং শুধু তাদের সম্পর্কের কথা চিন্তা করেই তোমার সময় কাটে। তাই বলে তাদের শেষ ইচ্ছে তোমার ইচ্ছের প্রতিফলন হতে পারে না।
মাকে বাঁচানোর জন্য বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে তোমার বিরুদ্ধে বাবার এক ধরনের শত্রু-শত্রু ভাব চলে এলো। তুমি যা বল তার উল্টোটি বলাই যেন তার ব্রত এবং তিনি যা বলেন, তার বিরোধিতা করাই যেন তোমার পণ। তিনি যে কাজই তোমায় করতে বলেন, তুমি তার বিরোধিতা কর। মা ভুল করলেও তুমি মায়ের পক্ষ নিয়ে তার সাথে বিরোধ কর। বাবার বিরোধিতা যে তুমি সজ্ঞানে করতে, তা নয়। না বুঝেই যে কোনো বিষয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। আবার, মা গালি শুরু করলে তুমি তারও প্রতিবাদ করতে। কিন্তু বেশিক্ষণ প্রতিবাদের সময় পেতে না। বাবার হাত উঠে আসত মায়ের গায়ে।
তোমার হয়তো মনে আছে, দশ বছর বয়সের কথা। তোমাকে দেরাদুনের একটি আবাসিক স্কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। মা চাননি, তবে বাবা মনে করেছিলেন এতে তোমার ভালো হবে। তুমি শান্তিতে লেখাপড়া শিখতে পারবে। প্রথমদিকে তোমারও ভালো লেগেছিল। মনে করেছিলে, ওখানে গিয়ে, এদের থেকে দূরে বসবাস করলে তোমার আর বাবা-মায়ের রক্তাক্ত বিবাদ দেখতে হবে না। তবে যাত্রাকালে টের পেলে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। তোমার ভাইবোন যখন তোমার জামা টেনে ধরল, তখন বুঝলে তাদের জীবনে কী সর্বনাশ নেমে আসছে! কিন্তু তোমাকে যেতেই হলো। সেখানে গিয়ে সারাক্ষণ বাবা-মার সম্পর্ক তোমায় তাড়িয়ে বেড়াত। পড়াশোনো, খেলাধুলা, শ্রেণিকক্ষ- সব কাজের মাঝে তোমার মনে গুমোট মেঘ জমে থাকত। পরীক্ষার ফল খারাপ হতে শুরু করল। খুব চিন্তা না করেই এমন অনেক অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে, যা দেখে শিক্ষক ও অন্য বন্ধুরা তোমায় পাগল ঠাউরাতে শুরু করল। তুমি তাদের বোঝাতে চাইতে, কিন্তু তুমি কেন এমন হয়ে যাচ্ছ, তা তাদের কাছে আজ অব্দি অজানাই রয়ে গেছে। বোঝাতে পারনি। ক্লাসের মাঝে পুরুষ শিক্ষকদের দিকে তাকিয়ে তুমি তাদের চেহারা দেখে বুঝতে চাইতে- কে কে রাতে তাদের স্ত্রীদের মারধর করেছেন। কোনো না কোনো চিহ্ন থাকবেই। মাঝে মাঝে দু’একজন শিক্ষিকাকে দেখে তোমার মনে হতো, তারা স্বামীর অত্যাচার সহ্য করে সারারাত না ঘুমিয়ে স্কুলে এসেছেন। প্রায়ই কয়েকজনের ঠোঁটের কোণে কাটা দাগ চোখে পড়ত। তখন তোমার মায়ের কথা মনে পড়ে যেত, বাবার কথা মনে পড়ে যেত, ভাইবোনের কথা মনে পড়ে যেত। তুুমি দিব্যি দেখতে পেতে, মা বাবার হাতে মার খেয়ে সারারাত দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে নিজেকে আরও রক্তাক্ত করছেন। বাবাও সারারাত অনুশোচনায় জেগে রয়েছেন। এ-ই চলছিল দিনের পর দিন, রাতের পর রাত।
মা তোমায় চিঠি লিখতেন। বাবাও লিখতেন। তবে তারা এক সাথে লিখতেন না। তুমি চাইতে তোমার মাতা-পিতা তোমায় একই পৃষ্ঠায় লিখুন। তুমি জানতে, তা কখনও হবার নয়। তুমি বাবার পত্রের উত্তর দিতে না। ইচ্ছে করত না। বাবাকে কী লিখবে, ভেবে পেতে না। মায়ের কাছে চিঠির ভেতরে তোমার ভাইবোনের কাছেও লিখতে। মা তাদের পড়ে শোনাতেন। ওরাও তাদের কাঁচা হাতে তোমার চিঠির উত্তর দিত। একবার অনেক দন মায়ের চিঠি এলো না। বাবা তার পত্রে লিখে জানালেন, মাকে ঢাকা শহরে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার বড় অসুখ হয়েছে। তিনি খুলে বলেননি, কী হয়েছে। তিনিও শহরে গিয়ে থাকছেন। ভাইবোনকে সঙ্গ দিতে তোমাদের দাদিমা এসেছেন গ্রাম থেকে। তোমার মনে হয়েছিল, তখনই ছুটে ঢাকায় গিয়ে মায়ের কাছে চলে যাও। কিন্তু কাকে বলবে? স্কুলের কেউ জানে না তোমার মনের ভেতর কিসের ঝড় বইছে। সহ্য করে থাকতে হয়েছিল।
তোমার পরীক্ষার ফল আরও খারাপ হতে শুরু করল। বাবার কাছে চিঠি গেল, তোমায় সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এমন অবাঞ্ছিত ও খারাপ ছাত্রকে সেখানে তারা রাখতে চান না। স্কুলের বদনাম হবে। তোমাকে বেরিয়ে আসতে হলো। তোমার ছোট মামা গিয়ে তোমায় দেশে নিয়ে এলেন। নানাবাড়িতে এসে উঠলে। এসেই তুমি জানতে পারলে, তোমার মায়ের মানসিক চিকিৎসা করানোর জন্য তাকে ঢাকা শহরে নিয়ে হাসপাতালে রাখা হয়েছে। মানসিক রোগ বলতে সবাই তখন ‘পাগল’ বোঝে। তুমি দেখলে, চারপাশ থেকে আত্মীয় সবাই ফিসফিস করে তোমায় বলছে- ‘তোমার মা পাগল হয়ে গেছে; তুমি পাগলের ছেলে।’ আরও জানতে পারলে, সবাই তোমার বাবাকে ‘পাগল’ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আবার বিয়ে করার পরামর্শ দিচ্ছেন। বাবাও নাকি বেশ ক’জন বিবাহেচ্ছু নারীকে তার হবু স্ত্রী হিসেবে দেখেও ফেলেছেন। এসব জানার পর তোমারও নিজেকে সত্যিই পাগল মনে হলো।
মামার কাছে জানতেও চাইলে যে, তোমাদের কী হবে। মামা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, তোমার বাবাকে তিনি ভয় দেখিয়েছেন। আবার বিয়ে করলে তাকে খুন করে ফেলার ভয় দেখিয়েছেন তিনি। মামা বলেছিলেন, ‘চিন্তা করিসনে; তোর বাপ বিয়ে করবে না। তোর মাকে নিয়েই ওকে থাকতে হবে; সে ব্যবস্থা আমি করেছি।’ মামার কাছে একটি পিস্তল ছিল, তা তুমি জানতে। পিস্তলটি চুরি করার ইচ্ছে জেগেছিল তোমার মনে। ওটি পেলে তোমার বাবা-মাকে এক সাথে গুলি করে মেরে একই গর্তে কবর দেওয়ার ইচ্ছে তোমার হয়েছিল। তাহলে তোমাদের জীবনের সব সমস্যা মিটে যাবে।
বাবা-মা ঢাকা থেকে ফিরে এলেন। বাবা বিয়ে করলেন না। বিয়ের কোনো কথাও উচ্চারিত হলো না। তুমিও নতুন করে সবকিছু শুরু করতে চাইলে। ভাইবোনকে তোমার মনের সাথে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললে। ওদের জন্যই তোমায় মাথা উঁচু করে থাকতে হবে। এমন ভাবনা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে তুমি কিছুদিন গাঁজা টেনে দুঃখ ভোলার চেষ্টা করলে। মদ্যপানও শিখলে। বেশি দিন নেশা করতে তোমার ভালো লাগেনি। ওসব ছেড়ে বন্ধুদের সাথে রাজনীতিতে গেলে। সেখানেও তোমার মন বসেনি। ছাত্র-রাজনীতিকদের তোমার কাছে পোষা প্রাণী মনে হতো। কেউ যেন দড়ি দিয়ে বেঁধে একদল শিশু-প্রকৃতির মানুষকে দিনমান ঘোরাচ্ছে- দিকহীন একদল মানুষ অন্যের কথায় আরেকজনের ধনদৌলৎ ধ্বংস করছে আর অন্যকে পেটাচ্ছে। তোমার সময় রাজনীতির প্রান্তর ছিল অতিশয় রক্তস্নাত। মন দিলে পড়ালেখায়। ফলও ভাল হলো। তোমার বয়েসি বেশ কয়েকজন নারী তখন তোমায় পছন্দ করেছিল। তোমায় কাছে চাইত। প্রেমিক হিসেবে, তাদের ভবিষ্যতের অংশীদার হিসেবে। তুমিই তাদের কাছে আসতে দাওনি। তাদের বিশ্বাস করতে পারনি। কাউকে আপন ভাবতে পারনি; ভয়ে কুঁকড়ে গেছ। সংশয় ছিল নিজেকে নিয়ে- তুমি কেমন বাবা হবে, তারা কেমন মা হবেন!
পড়ালেখা শেষ করে এক শিপিং কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে চলে গেলে চট্টগ্রাম। যদিও এ চাকরি তোমার পছন্দের ছিল না, তবুও নিজের পায়ে দাঁড়াতে তুমি গেলে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ঢাকায়ও অনেক উপায় ছিল, তবে তুমি চলে যেতে চাইলে। তখন তোমার ভাই সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট; বোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তুমি বুঝেছিলে, তারা বাকি পথ নিজেরাই খুঁজে নিতে পারবে। তুমি আজও বুঝতে পার না- এতকিছুর পরও তোমরা কেন অপথে-বিপথে চলে যাওনি! তোমাদের তো হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, আত্মহত্যা করার কথা ছিল। তোমাদের স্বজনেরা তা-ই আশা করছিলেন। তোমরা বিপথে গেলেই তারা যেন আনন্দ পেতেন। এমন মা-বাবার সন্তানেরা আর কী হবে, কতদূর যাবে!
তোমাদের বাবা অবশ্য অনেক দিন ধরে কেমন যেন স্তিমিত হয়ে যাচ্ছিলেন। তুমি বোধহয় তা খেয়াল করনি। যেদিন সেই পনেরো বছর বয়সে মাকে রক্ষা করার জন্য বাবাকে রুখেছিলে, সেদিন থেকেই তিনি কেমন যেন ঝিমিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আর ধর্ম-কর্মের জন্য তোমাদের তেমন তাড়া দিতেন না। রাগ উপচে পড়লেও তিনি আর মাকে মারতে আসতে সাহস দেখাতেন না। তোমরা যখন তা খেয়াল করলে, দেখলে তোমাদের মা-ই তার ওপর চড়াও হয়ে থাকেন। মায়ের ব্যবহার সারাক্ষণই উত্তপ্ত থাকে। মাঝে-মাঝে মনে হতো, মাকে থামাতে হবে, বোঝাতে হবে। ততদিনে তাদের কলহে তোমার আকর্ষণ নিষ্প্রভ হয়েছে; তুমি তাদের একাকী ছাড়তেই বেশি পছন্দ কর। তাদের সাথে প্রায়ই ফোনে কথা হতো, তবে একে-অপরের প্রতি বিদ্বেষ ছাড়া আর কোনো প্রসঙ্গই তাদের ছিল না। তাই তাদের সাথে তোমার ফোনে আলাপচারিতাও কমে গেল। বোনের দেখাশোনা তোমার ভাই-ই করে। তাই তুমি কিছুটা চিন্তামুক্ত।
এরই মাঝে বাবা একদিন তোমায় ফোন করে মনে করিয়ে দিলেন, তার মৃত্যু হলে তাকে কোথায় দাফন করতে হবে। তাদের কবর সংক্রান্ত কাগজপত্র কোথায় রেখেছেন, তাও জানালেন। অনেক দিন পর আবারও তাদেরকে এক ঘরে রাখার চিন্তা তোমার মনে ভর করল। আবারও ভাবলে বিষয়টি নিয়ে। টের পেলে, আগে যে কবরকে তুমি গর্ত বলতে, এখন তাকেই তুমি ঘর বলে ডাকছ। বাবা-মাকে এক ‘গর্তে’র পরিবর্তে এক ‘ঘরে’ রাখতে চাও। তারা প্রায় ৩৫ বছর এক ছাদের নিচে সময় পার করেও ঘর পাননি।
দুঃসংবাদ এলো, একদিন। ভাই ফোনে জানাল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি এসে দেখলে তোমাদের বাবার হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে বন্ধ ছিল কিছুক্ষণ। বোন ট্যাক্সিতে করে কোনোমতে মিলিটারি হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। ডাক্তাররা তাকে সিপিআর দিয়ে অলৌকিকভাবে ফিরিয়ে এনেছেন, কিন্তু পক্ষাঘাতে নিঃসাড় হয়ে গেছে তার দেহ। হর-রকম যন্ত্র দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। জীবন্মৃত বলা যায়।
মায়ের মাতম আর থামে না। তোমরা অবাক হয়ে দেখলে তার বিলাপ। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। তারপর তোমার কাছে মায়ের কান্না ভালোবাসার ফল্‌গুধারা বলে মনে হলো। এতদিন তিনি স্বামীর অত্যাচারে কেঁদেছেন, রেগেছেন; আজ ভালোবাসায় কাঁদছেন। তুমি, তোমরা এ-ই তো চেয়ে এসেছ চিরদিন। নিজেরাও মনে মনে বললে, ‘কাঁদো মা; কাঁদো। বাবার জন্য তোমার কান্না আমাদের মন ভরিয়ে দিচ্ছে।’ মায়ের হয়তো আশা ছিল, তার স্বামী নিঃসাড় অবস্থা থেকে ফিরে আসবেন, তবে চিকিৎসকরা তোমাদের পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন- তিনি আর ফিরবেন না। ওখানেই শেষ। ফেরার কথাও না। হূৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে ছিল বেশক্ষণ। জীবন থেকে তলিয়ে যাওয়ার একেবারে আগ-মুহূর্তে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
বাবা চলে যাচ্ছেন জেনেই তুমি খুঁজতে গেলে খানকা-শরিফের কাগজপত্র। বাবার আলমিরাতেই ছিল। তিনিই দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। দেখলে শুধু বাবার কাগজগুলোই আছে। মায়েরটা নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পেলে না। এ নিয়ে কারও সাথে আলাপও করলে না। তুমি হয়তো জানতে, মা এমনটি করতে পারেন। তিনি কখনোই ওই খানকা-শরিফে গোরস্থ হতে চাননি। তার স্বামীর পাশে থাকতে চাননি। এমন সময় কী করতে পারতে তুমি? তোমার ভাইবোন হয়তো চাইবে বাবাকে তার ইচ্ছেমতো দাফন করতে। তুমি তা হতে দিতে চাওনি। তুমি তড়িঘড়ি করে শহরের একটি কবরস্থানে তাকে দাফনের ব্যবস্থা করলে। সবাইকে বলেছিলে, খানকা-শরিফ অনেক দূরে; তোমরা সেখানে ঘন ঘন যেতে পারবে না। সবাই রাজিও হয়েছিল। তোমার ইচ্ছে ছিল ভিন্ন। তুমি খুব সন্তর্পণে ভেবে রেখেছিলে, কোনো একদিন সম্ভব হলে তোমাদের মাকেও একই কবরে শায়িত করবে। অতি আদরের সাথে তুমি ও তোমার ছোট ভাই বাবার দেহটি ধরে নামিয়ে মাটির ঘরে শুইয়ে এসেছিলে। সেদিন নিজেকে তোমার কিছুটা ভারমুক্ত মনে হয়েছিল। ভেবেছিলে, আর কোনোদিন বাবা-মায়ের কলহ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। মুক্ত মনে হয়েছিল।
সেই তুমি আজ সেই কবরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছ। এইমাত্র মাকেও এই একই ঘরে নামিয়েছ। বাবার মৃত্যুর পর বারো বছর পেরিয়ে গেছে। এই ক’বছর তুমি এই কবরটি সযত্নে সংরক্ষণ করেছ। অন্য কাউকে যেন এখানে দাফন না করে, সেদিকে তুমি বিশেষ নজর দিয়েছ। বাবা চলে যাওয়ার পর মা অনেকটাই একা হয়ে গিয়েছিলেন। মায়ের একাকিত্ব তুমি বুঝতে, কিন্তু তুমি চেয়েছ মা তার একাত্বি বুঝুন। একাকিত্বই তাকে জীবনের প্রতি অনানুরাগী করে ফেলেছিল। সারা জীবন যে মানুষটির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে ছিলেন, তিনি চলে গেছেন। জীবনটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। ছেলেমেয়ের উপস্থিতিও তাকে বাঁচার প্রেরণা দিতে পারেনি। গেল দু’বছর অনেক অসুখের সাথে এলোপাতাড়ি লড়েছেন। তিনি লড়তে চাননি; তোমাদের চাপে তাকে অনেক চিকিৎসা নিতে হয়েছে। তার ইচ্ছেই ছিল না। বাবা চলে যাওয়ার পর মা আর খানকা-শরিফের প্রসঙ্গ তোলেননি।
মা তোমাদের প্রায়ই বলতেন, তার মৃত্যুর পর তোমরা যেন তাকে তার বাবার গ্রামে নিয়ে সমাধিস্থ কর। তুমি তখন তার কথায় রাজি হয়েছিলে। তবে তার কথামতো কাজ তুমি করনি। আজ তুমি তার শব কবরে নামিয়ে দিলে- ঠিক যেখানে তোমার বাবাকে নামিয়েছিলে। কবরকে তুমি তাদের জন্য ঘর মনে কর। তুমি সব সময় তাদের জন্য ঘর খুঁজতে। দু’জনকে আজ এক ঘরে রাখতে পেরেছ। তোমার চেয়ে সুখী আর কে আছে! সারা জীবন এ-ই তো চেয়েছিলে। তাহলে দাঁড়িয়ে কেন? খুশি মনে বাড়ি ফেরো! তোমার অভিলাষ পূর্ণ হয়েছে। তুমি খুশি, সুখী। বিমর্ষ কেন? মলিন কেন? বাবা-মা’র জন্য ঘর পেয়েছ।
তোমার পা নড়ছে না; মনে সেই খুশি নেই। বাড়ি ফিরতে মন চাইছে না। যে দু’জনকে একই কবরে শুইয়ে রেখেছ, তাদের নিজ-নিজ চাওয়ার কথা মনে হচ্ছে আজ। মনে হচ্ছে, তুমি ঠিক কাজটি করনি। এ চাওয়া তোমার; তাদের নয়। তারা চেয়েছিলেন তাদের মতো করে; তোমার মতো নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

New Prophets

The day they wanted to cut my hair off, I lost my spirit, That says the universe Is made o…