Photo - Goggle

কর্পোরেট ফ্লার্টিং বা টাংকি

আপনি অনেক মন দিয়ে কাজ করছেন। ঠিক তখনই আপনার দরজায় নক্-নক্ করে আপনার টীমেরই এক নারী সহকর্মী বললেন – ‘ভাইয়া, আসতে পারি?’ আপনি বললেন, ‘আরে, এসো।‘ সহকর্মী এসে আপনার সামনে দাঁড়ালেন। আপনি বললেন, ‘বসো’। আপনি খেয়াল করলেন, মেয়েটির চোখের পাতা প্রজাপতির ডানার মত ঝাপটাচ্ছে; মুখটা হাসি-হাসি। তিনি বসে আছেন এবং আপনি যে কাজ করছিলেন, তাইই করছেন। বা করার ভান করছেন। সহকর্মী সাহস সঞ্চয় করে, আলতো গলায় বললেন, ‘ভাইয়া, আপনার শার্টের রং’টা দারুণ; অনেক মানিয়েছে আপনাকে।‘ আপনি সেইরকম খুশি হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে, জানতে চাইলেন, ‘এই তোমার বাচ্চারা কেমন আছে? জামাই? ওরা ভাল আছে তো?’
সহকর্মী বুঝে গেছেন তিনি আপনার কর্পোরেট-মন ভজাতে পেরেছেন। কাজ থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে চাইতেই, তিনি এক জটিল সমস্যা সমাধানের কথা বলেন। আপনি শুনে, তড়িৎ গতিতে সমাধান দিয়ে দেন। আপনাকে দেখতে সুন্দর লাগছে, একথা না বললে আপনি হয়তো তাকে কয়েকদিন ঘোরাতেন। তার আর ঘুরতে হলো না। কাজ হয়ে গেল।
এই নারী সহকর্মী যা করলেন, তাকেই বলে কর্পোরেট ফ্লার্টিং। ফ্লার্টিং-এর বাংলা ‘টাংকি মারা’।
এই টাংকি একজন নারী বসের সাথে এক বালক সহকর্মীও করতে পারেন। তবে তা আমাদের দেশে কম বলেই মনে হয়…
আপিস-কার্য সিদ্ধির জন্যে আপনি একজন নারী সহকর্মীর সাথে টাংকি মারতে চান? তাহলে অনেক অনেক বেশি শৈল্পিক হতে হবে।
কর্পোরেট ফ্লার্টিং-এর সাথে আসলে প্রেম-ভালবাসা ও যৌনতার সম্পর্ক নেই। একেবারেই দাপ্তরিক বা ব্যবসায়ীক টাংকি এটা। অনেকে বিজনেস ফ্লার্টিং-ও বলে। আসল উদ্দেশ্য হছে যেই মানুষটির কাছে কাজ বা যার মন জয় করতে হবে, তার সাথে একটা সুন্দর মানসিক যোগাযোগ স্থাপন করা। ইংরেজিতে ‘কানেকশান’ বলা যায়। কর্পোরেট ফ্লার্টিং হচ্ছে সেই শিল্প। কোন লেনদেন [চাওয়া-পাওয়া] শুরু করার আগে সামাজীকায়নের একটি পর্ব।
ঐযে সেই নারী সহকর্মী, যিনি আপনার শার্টের প্রশংসা করেছিলেন, তিনি এই শিল্প অনেক ভাল বোঝেন। মেয়েরা কর্পোরেট ফ্লার্টিং ছেলেদের চেয়ে ঢের বেশি বোঝে। যোগাযোগ স্থাপন বেশি করতে পারে। পুরুষরা যে কম বোঝে তা টের পাওয়া যায় যখন কোন পুরুষ এমন কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নারী সহকর্মীর কাছে যায়। ভাইয়ারা নারীর সৌন্দর্য নিয়ে একটু বেশি আপ্লুত থাকেন তাই আলাপ শুরুর আগে তাকে একবার দেখে নেয়ার প্রবণতা থাকে। আপিস-টাংকিটা তেমন জমে না।
একটা ছেলে মেয়েটির কাছে গিয়ে কি বলবে? “আপু [আজকাল আপা চলে না], আপনাকে আজ খুবই সুন্দর লাগছে”। “আপু, এই শাড়িটা কোথা থেকে কিনেছেন? আমার বৌকে শোরুমের খবরটি দেব”। “আপনার গতকালের স্ট্যাটাসটা পড়ে খুব আনন্দ পেয়েছি; আপনার ভাষা খুব-খুব সুন্দর”।
এমন অনেক কিছুই বলা যায় তবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে আপনার ফ্লার্টের প্রসঙ্গ কি হবে। নারীর মন ভজানোর বিষয়গুলো এমনিতেই পুরুষরা কম জানে, তারপর আবার আপিস ফ্লার্টিং!
সাবধান! নারী সহকর্মীদের সাথে ফ্লার্ট বেশি করা যাবে না। হয়রানির দায়ে ধরা খেতে হতে পারে। একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ে যতই টাংকি মারুক, ছেলেটি জীবনেও হয়রান হবে না, কিন্তু কোন মেয়ের সাথে টাংকি একটু বেশি হলেই জীবন হবে ফানা-ফানা।
সুন্দর করে টাংকি মারার কিছু শারীরিক ভাষা আছে। ভুল বুঝবেন না; এই শরীর সেই শরীর নয়। কিছু মানসিক ভাষাও আছে…
কর্পোরেট ফ্লার্টিং-এ শারীরিক ভাষা যতই মূল্যবান হোক না কেন, প্রজাতন্ত্রের কর্তা-ভাইদের সাথে টাংকি মারা এক সুপার-কিউপিডের কাজ। এদের সাথে ফ্লার্ট করা সম্ভব নয়; সহজে মন গলে না।
এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান পেশাজীবী টাংকিবাজ নিয়োগ দেয়। এই টাংকিবাজদের দলকে আদর করে কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স বা রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডাকা হয়। এই দলের ছেলেরা কেমন যেন জ্বীনের মত কাজ করে। কি যে করে ওরাই বোঝে। এরা হচ্ছে সুপার-টাংকিবাজ। মেয়েরা যতই কর্পোরেট ফ্লার্টিং-এ এগিয়ে থাকুক না কেন, রেগুলেটরি টাংকিতে তারা পিছিয়ে থাকে।
মেয়েদের শারীরিক ভাষা ছেলেদের চেয়ে ভাল। লক্ষ্য করলে দেখবেন, আপনি একজন মেয়ের উদ্দেশ্যে কথা বলার সময় মেয়েটি ওপর-নীচ মাথা ঝাঁকায়। যেন তিনি সায় দিচ্ছেন। ছেলেরা এ কাজ করে না। শক্ত চেহারা [একটা বস-বস ভাব] নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। দাঁড়িয়ে থাকলে দু’পা ফাঁক করে একটু পেছনে হেলান দেয়ার ভাব করবে; দুই হাত পকেটের মধ্যে থাকবে। ছেলেদের দেহভঙ্গিমা অন্যের সাথে ‘কানেক্ট’ করার একটা অন্তরায়। সামনে যিনি দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন তেমন ভজিত হন না। দেহভঙ্গিমায় মেয়েরা এগিয়ে।
মেয়েরা কথায়ও এগিয়ে। এক গবেষণায় দেখা যায় মেয়েরা দিনে একুশ হাজার শব্দ বলে; ছেলেটা বলে বারো হাজার। আরেক গবেষণা বলছে, মেয়েরা বলে কুড়ি হাজার, ছেলেরা নয় হাজার। মেয়েরা দু’টোতেই এগিয়ে। কথা যিনি বেশি বলেন, তিনি কানেক্ট করেন বেশি।
এখন আসি, এই কর্পোরেট ফ্লার্টিং প্রয়োগ করে আসলে কি কোন ফায়দা হাসিল হচ্ছে? অবশ্যই হচ্ছে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন চারিদিকে ফ্লার্টিং এবং ফ্লার্টিং। গ্রাহকের সাথে, সাংবাদিকের সাথে, কর্তা-ভাইদের সাথে, টীম-মেইটদের সাথে, বসের সাথে, বসের বসের সাথে, বন্ধুদের সাথে [এদের সাথে টাংকিটা আজীবন চালিয়ে যেতে হয়, না হলে বন্ধুরা আপনার জানাজাতেও আসবে না], স্ত্রীর সাথে, স্বামীর সাথে, সন্তানদের সাথে, দোকানদারের সাথে এবং আরও অনেকের সাথে।
মাঝে-মাঝে মনে হবে, ফ্লার্টিং-টাই জীবন, টাংকি মারার জন্যেই আপনার জন্ম হয়েছে, আরেকজনকে তোষামোদ করতে করতে জীবনটা পার করাই জীবন।
যদি তাই হয়, তাহলে হ্যাপী ফ্লার্টিং, মারতে থাকুন টাংকি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *