Ekram Kabir

ক্যাডেট জীবনের ইতিকথাঃ প্রথম মিনার

ভাষা শহীদদের স্মরণ করা এবং শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার প্রথম স্মৃতি ঝিনাইদাহ ক্যাডেট কলেজের এই শহীদ মিনারটি। এই মিনার দেখতে দেখতেই আমি বেড়ে উঠেছি – সেই ছোট্ট কাল থেকে আজঅব্দি এই মিনারটিই আমার মস্তিস্কে ছাপা হয়ে আছে। মিনারটি তৈরীর কথা মনে নেই।
আমি তখন অনেক ছোট। প্রথম যেদিন ক্যাডেটদের এবং আমার বাবার সাথে প্রভাতফেরীতে বেরিয়েছিলাম খালি পায়ে, পাঞ্জাবী-পায়জামা, তার ওপর গায়ে ওম সোয়েটার পরে – সেদিনের কথা মনে আছে।
মা অতিভোরে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে, দাঁত মাজিয়ে দিয়ে, কয়েকটা বিস্কুট মুখে গুঁজে দিয়ে আমার হাত বাবার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
‘যা বাবা; একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাতফেরীতে যা; আব্বু যাচ্ছে; আব্বুর হাত ধরে যাও’।
মনে আছে জানতে চেয়েছিলাম প্রভাতফেরী কি। তখন ‘প্রভাত’ শব্দের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল, কিন্তু ‘ফেরী’ অর্থ কি তা জানতাম না। মা বলেছিল, প্রভাতফেরী হচ্ছে ‘সঙ্গিত দিয়ে ভোর বন্দনা’।
বুঝি নি।
না বুঝলেও বাবার হাতে হাত রেখে খালি পায়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। একেবারে ক্যাডেটদের হাউসগুলোর সামনে।
সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামা পরে, পাঞ্জাবীর ওপর খাঁকি সোয়েটার পরে, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো’ গাইতে গাইতে সারা কলেজ প্রদক্ষীন করে এসে, এই মিনারকে ঘিরে শহীদদের স্মরণে গান গাইতে থাকলেন। সব গান আমার মনে নেই, শুধু ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো…’ মনে আছে।
সময় পেরুলো…
মা প্রতিবছরই আমায় পাঞ্জাবী-পায়জামায় সাজিয়ে দেয় বাবার হাত ধরে শহীদের বন্দনায় সামিল হওয়ার জন্যে। বাবা তখন গান-কবিতা লেখেন। বেশির ভাগই গান। স্পষ্ট মনে আছে ক্যাডেটরা শহীদ মিনারে চারিপাশে বসে তাঁর লেখা গান গাইছেন। বাবা সেই সময় থেকে ঝিনাইদাহ শহরের ‘প্রগতি স্টোর’ থেকে তাঁর খাতা কিনে নিয়ে আসলেন।
বাবা লিখেছিলেনঃ-
<<যায় যাক্, যায় যাক্ মোর প্রান রক্ত করিবো দান বাংলার ঘরে ঘরে ক্তহীন এই বুকে রক্তহীন এই প্রাণ...>>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *