Ekram Kabir Photos

ক্যাডেট জীবনের ইতিকথা – ১

ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়ালাম অনেকদিন। নানাবাড়ি গেলাম; অনেক দিন কাটিয়ে সেখানে অনেক বন্ধুবান্ধব জুটলো; মামার রেডি-মেইড কাপড়ের দোকানে দোকানদারী করলাম। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা থানার কলাবাড়ি গ্রামে দাদাবাড়ি গেলাম। সেখানে বাবার বন্ধুর দোকান থেকে পাতার বিড়ি কিনে টানলাম। তিনি [বাবার বন্ধু] কিছু মনে করলেন না; তিনি জানালেন গ্রামে নাকি চাচা-ভাতিজা একসাথে বিড়ি টানে। বাবার অর্থাভাব থাকায় আমার অন্যান্য বন্ধুর মত কক্স-বাজার যেতে পারলাম না। তবে দুঃখ হয় নি; বাবার অর্থাভাব আমি চিরকালই মেনে নিয়েছিলাম।

পরীক্ষার ফল দেয়ার সময় আসতেই টনক নড়লো। ভাবলাম পাশ করবো’তো? আমি একজন খারাপ ক্যাডেট তথা খারাপ ছাত্র। ক্যাডেট কলেজে সব খারাপ ছাত্রই খারাপ ক্যাডেট। স্টার নম্বর পেলাম না, তবে প্রথম বিভাগে পাশ করে গেলাম। পাশ’তো করলাম, এবার আমার কলেজে আমায় একাদশ শ্রেনীতে পড়তে সুযোগ দেবে’তো?

আমি ঝিনাইদাহ ক্যাডেট কলেজের ক্যাম্পাসেরই ছেলে। বাবা কলেজে পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। বাবার পড়াশোনার বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি। তাঁর কাছে জানতেও চেয়েছি তিনি কেন পদার্থবিদ্যা পড়লেন। তিনি বলেছিলেন বিষয়টি তাঁর ভাল লাগতো, তাই। বাবা আমায় নবম-দশম শ্রেনীতে পড়ার সময় পদার্থবিদ্যা এবং রসায়ন পড়িয়েছিলেন তাই রক্ষা। লেটার পেয়ে গেলাম এই দুই বিষয়ে। আরো দু’টি লেটার পেলাম জ্যামিতীক প্রকৌশল ও কাঠের কাজে। খুশি দেখে কে!

তবে খুশির দড়ি ছিঁড়ে গেল যখন জানতে পারলাম আমায় কলেজে ফেরত নেবে কিনা তা একটি দোদুল্যমান অবস্থায় আছে। নাও নিতে পারে। আরও শুনলাম আমার মত আমাদের ব্যাচে নাকি তেরোজন আছে। তারাও দোদুল্যমান। মনে সাহস পেলাম। আমি একা নই। আমি নিয়ে চৌদ্দজন। চৌদ্দজনকে কলেজ থেকে নিশ্চয়ই বের করে দেবে না।

সময় ঘনিয়ে এলো। আমায় নেবে কি নেবে না, জানি না। বাবা হয়’তো জানতেন। তাঁকে অনেক সন্ত্রস্ত দেখতাম। আমার এখন মন খারাপ হয়। আমি খারাপ ক্যাডেট ছিলাম বলে বাবা অনেক কষ্ট পেয়েছেন।

একদিন কথা হল এবারউদ্দীন চাচার সাথে। তাঁকে আমি ক্যাম্পাসে চাচা বলে ডাকতাম; আর কলেজে হয় ‘এবারউদ্দীন স্যার’ অথবা মিঃ এবারউদ্দীন। ঝিনাইদাহ ক্যাডেট কলেজ ক্যাম্পাসে আমরা যে বাড়িতে থাকতাম তিনি থাকতেন তার উত্তর-পশ্চিমের বাড়িতে – কোনার বাড়িতে। তিন বছর বয়স থেকে তাঁকে দেখছি। তিনিও আমায় দেখছেন। স্যার আমায় আমার বাবার ছেলে হিসেবে ‘তুমি’ বলে ডাকেন এবং ক্যাডেট হিসেবে ‘তুই’ বলেন।

একদিন বিকেলে আমি আর নাদীম রাস্তায় হাঁটছিলাম; তিনি সাইকেল চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। আমায় দেখে ডাকলেন। নাদীমকে নয়। কাছে গেলাম।

‘কবীর, শোনো; তোমাকে কলেজে ফেরত নিতে চাচ্ছে না। আমি চাই তুমি কলেজে ফেরত আসো। আমি তোমায় হুনাইন হাউস থেকে খায়বার হাউসে নিয়ে আসতে চাই। এ’কাজ করতে পারলে তোমার কলেজ থেকে বহিস্কার আমি ঠেকাতে পারবো। তুমি রাজী?’

ততদিনে আমার অন্যান্য ক্যাডেট কলেজের ব্যাচমেইটদের সাথে পরিচয় হয়েছে। একটু বেশি বিশ্ব দেখেছি। মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজের বন্ধুদের আমার মত দুষ্টু মনে হয়েছে। এও মনে হয়েছে, আমি যদি ঐ কলেজে থাকতাম, তাহলে আমায় কেউ খারাপ ক্যাডেট বলতো না।

স্যারকে বললাম, ‘স্যার আমার হাউস বদল না করে কলেজ বদল করে দিন; আমি শুনেছি এমসিসি’তে আমার মত অনেক ছেলে আছে এবং তারা নির্বিঘ্নে কলেজে বসবাস করে; প্লীজ, আমায় সেখানে পাঠিয়ে দিন।“

মিঃ এবারউদ্দীন সাইকেল ফেলে দিয়ে পড়িমরি করে আমাত দিকে ছুটে আসলেন। চড় উঠিয়ে বললেন, ‘শয়তান, আমি ভাবছি তোকে আমি কি করে কলেজে রাখা যায়, আর তুই নতুন আইডিয়ার কথা বলছিস্; চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেব!’

সত্যি-সত্যি চড় উঁচিয়ে মারতে আসলেন। বেগতিক দেখে বললাম, ‘স্যার, আপনি যা বলছেন তাই হবে; আমি খায়বার হাউসেই যাব; ওখানে আমার অনেক ভাল-ভাল বন্ধু আছে। শাকিল, আওসাফ, হাসান – ওরা আমার খুব ভাল বন্ধু।‘

‘তোকে আমি আমার দায়ীত্বে নিচ্ছি বলে আমি প্রিন্সিপালকে বলেছি। আমায় নিরাশ করিস না’।

আমি বলি, ‘ইয়েস, স্যার’।

সময় যায়। শুনলাম আমাদের সব বন্ধুরা কলেজে ফিরে এসেছে; শুধু চৌদ্দজন আসে নি। চৌদ্দজনের নামও জানলাম। বায়ান্ন’জনের মধ্যে চৌদ্দজনই আন্ডার-কন্সিডারেশন!? বলে কি? প্রিন্সিপাল স্যারের কি মাথা খারাপ হয়েছে? এতোগুলো ছেলেকে আন্ডার-কন্সিডারেশন রেখেছেন!

প্রিন্সিপাল তখন কর্নেল নুরুল আনোয়ার। দাম্ভিক অফিসার। প্রিন্সিপাল’স ইন্সপেকশনে এলেও দু’ঠোঁঠের মাঝে থাকতো জ্বলন্ত চুরুট। আমরাও উৎসাহ পেতাম। চুরুট না পাই, সিগারেট’তো জোগাড় করতে পারবো!

আমার দিন এলো। বাবা আমায় নিয়ে প্রিন্সিপালের আপিসে গেলেন। সাথে মিঃ এবারউদ্দীন। সেই তিনি, সেই সাইকেল।

আমি আর বাবা প্রিন্সিপালের সামনে বসে। বাবার মাথা নীচু। মিঃ এবারউদ্দীন আপিসের বাইরে অপেক্ষারত। এই প্রিন্সিপাল স্যার কেন যেন চাইতেন কলেজের সব শিক্ষকদের মাথা তাঁর সামনে নীচুই থাকুক। আমায় আর বাবাকে অনেক বকাবকি করলেন আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার। তারপর আমায় বললেন, ‘ব্লাডী ইকরাম; গো উইথ মিঃ এবারউদ্দীন।‘

আমি আগে বেরুলাম। বাবা পরে। আমি আর প্রিন্সিপাল স্যারকে সহ্য করতে পারিছিলাম না। মনে-মনে বাবার কাছে হাজারবার ক্ষমা চেয়েছি। আমার জন্য তাঁর মাথা নীচু করে থাকতে হয়েছে।

মিঃ এবারউদ্দীন বাইরেই ছিলেন। বাবাকে দেখে তিনি বললেন, ‘ঈদ্রীস ভাই, আপনি বাড়ি যান; আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি; এখন থেকে আমি ওকে দেখবো। ও এখন আমার হাতে।‘

বাবার মাথা নীচুই ছিল। তিনি চলে গেলেন ক্যাম্পাসে আমাদের বাড়ির দিকে।

আমার কাঁধে ব্যাগ। ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে মিঃ এবারউদ্দীনের কাছে এসে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন, ‘চল্।‘

তিনি সাইকেলে; আমি হাঁটছি। এবারউদ্দীন স্যার আমাদের তিনটি হাউসে দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন, ‘তাকিয়ে দেখ; হুনাইন আর বদর হাউসে পশ্চিম দিক থেকে সরাসরি রোদ পড়ে; খায়বার হাউসে পড়ে না। তোকে খায়বার হাউসে নিয়ে আসলাম তোর মাথা ঠান্ডা রাখার জন্যে। ঠান্ডা থাকিস্।‘

মিঃ এবারউদ্দীনঃ আপনাকে সালাম…

7 Replies to “ক্যাডেট জীবনের ইতিকথা – ১”

  1. এভাবে আমিও আমার বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম সেদিন। আমি জানি, উনি আমায় ক্ষমা কিরে দিয়েছেন।
    তা না হলে আজ আমি আজকের দিন গুলোর মত হাসি মুখে উনার সামনে দাড়েতে পারতাম না। উনি বুজতে পেরেছিলেন ক্যাডেট জীবন উনাদের কাটানো জীবন টার মত সাদাসিধে না। i am the luckiest son of the earth who got such father in his life.
    And i am lucky to be a cadet for having a world in side a world.

    আপনার সহজ সুন্দর লেখাতে ভাসমান স্মৃতি গুলো স্থায়ী ঠিকানা পেলো। শুভেচ্ছা জানাই আপনাকে।

    1. আমার লেখা পড়লে আমার ভাল লাগে…আরো লিখবো…

  2. অবশেষে নিজের একটি ওয়েবসাইট করলেন দেখে ভালো লাগলো। আশাকরছি আপনার সব লেখাই এখানে পড়তে পারবো। এই লেখাটি নিয়ে আপাতত কিছু না বলে বরং তাই ওয়েবসাইট নিয়েই লিখলাম।

  3. ভাইয়া,
    আমি ইসিএফ এ আপ্নার পোস্ট দেখেই, আপ্নার এই লিঙ্কে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। “এক দুষ্টু ক্যাডেটের গল্প” পড়ার পর থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম, এই লেখা গুলোর। এক নিঃশ্বাসে পড়লাম এই লেখাটাও , বইটার মতই। আবার অপেক্ষা শুরু করলাম, এর পরের লেখাটার জন্য…

  4. আপনাকে দেখে এবং আপনার সাথে কথা বলে কখনো মনে হয়নি যে আপনি দুস্টু ছিলেন। আপনার মাথা গরম এটা মেনে নেয়া যেনো আরো কস্টসাধ্য। আপনার জন্য শুভকামনা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.