Photo: Google

গল্পটি যে খুব গর্বের তা কিন্তু নয়। তবে বলার মত। প্রথম সিগারেটে টান দেয়ার গল্প।
আমরা যে সময়টিতে বড় হয়েছি, তা ছিল বিড়ি-সিগারেটের জয়ধ্বনির যুগ। জয়জয়কার। বাবা, চাচা, মামা, পাড়ার বড় ভাইরা, পড়শি – আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষই সিগারেটে আসক্ত।
সিগারেটকে রোমান্টিসাইজ করা হয়েছে অনেক গল্প-কবিতায়। প্রেমিকা আহলাদ করে বলবে, “কি’যে ছাই-পাশ খাও; ছেড়ে দাও!”। প্রেমিক এক গাল হাসি দিয়ে, আকাশের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে, বলবে, “এ’তো তোমারই মত; ছাড়া যায় না।“ কিংবাঃ “তোমার ঠোঠটা দাও, ছেড়ে দেবো।“
এমন কত কি!
হাজারো গল্প-কবিতা আছে। আছে সিনেমাও। ছেলেবেলায় ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে একটি সিনেমায় দেখেছিলাম মৃত্যুপথযাত্রী এক নায়ক তার জীবনের শেষ ইচ্ছে প্রকাশ করলেন – তিনি বন্ধুর হাতে জ্বলতে থাকা সিগারেটে একটি টান দিতে চান। টান দিয়েই তিনি মারা গেলেন।
নিউজউইক ও টাইম ম্যাগাজিনের পাতায়-পাতায় মার্লবোরো, কেন্ট ও কার্টিয়ের সিগারেটের বিজ্ঞাপণ জ্বল-জ্বল করতো। সাধে কি বলছি জয়জয়কার?
ধুমপান একটি স্বাভাবিক ব্যপার – কেউ এর ক্ষতিকারক দিক নিয়ে তেমন ভাবতেন না। কেউ-কেউ হয়’তো ভাবতেন। তারা সমাজে পাত্তা পেতেন না। ধুমপান এক ধরনের বীরত্ব হিসেবেই রাজত্ব করেছে।
উনিশ’শ সত্তর সালে আমার বয়স চার। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ক্যাপস্ট্যান সিগারেটের একটি প্যাকেট বিছানার নীচে পড়ে আছে। মনে আছে এখনও। বাবার।
তবে আমরা যখন আরও বড় হয়েছি, তখন বড় হয়ে ধুমপান করবো এমন কোন লক্ষ্য আমাদের ছিল না। যখন সপ্তম শ্রেনীতে, তখনও কারও ধুমপানের কথা মনে আসেনি।
তবে দেরী হয়নি।
অষ্টমে উঠেই কি যেন একটা ঘটলো। মনে হলোঃ বড় হয়ে গেলাম। বাবাদের মত, মামাদের মত। তো, বড় হয়ে কি করা যায়!? সবার আগে মনে এল সিগারেটের কথা। বড়রা সিগারেট টানেন।
আমাদেরও তাই; আমরাও। ততদিনে গল্প-কবিতা লেখারও ইচ্ছে জেগেছে। নারীদের প্রতি এক ধরনের মন-শারীরিক আকর্ষন তৈরী হয়েছে।
আমি ও আমার বন্ধু নাদীম বসবাস করি ঝিনাইদাহ ক্যাডেট কলেজ ক্যাম্পাসে। নাদীম আমার অবৈতনিক বন্ধু। অবৈতনিক বলছি এ’কারণে যে ওর কাছে কোন চাওয়া নেই, পাওয়া নেই এবং দেয়াও নেই। শুধুই বন্ধু। ওর কথা আরেকদিন বলা যাবেক্ষন।
অষ্টম শ্রেনীতে পড়তে-পড়তে ক্যাডেট কলেজের এক ছুটিতে দু’জনের মনে হল আমরা বড় হয়েছি এবং বড়দের আদলে কিছু একটা করতে হবে। কি করা যায়? প্রেম? নাহ! সম্ভব নয়। এখানে সব বালিকাই কোন না কোন চাচা-চাচীর মেয়ে। বাদ।
সিগারেট! ক্যাডেট অনেক বড়ভাইও সিগারেট টানেন। একেক-জন বীর।
অষ্টম শ্রেনীতে ওঠার পর, ঝিনাইদাহ উপশহরে একা-একা যাওয়ার অনুমতি আমাদের মা-বাবা দিয়েছিলেন। আমরা সাইকেল চালিয়ে যেতে পারতাম। ঝিনাইদাহ’কে আমরা ‘টাউন’ বলতাম।
একদিন সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ঝিনাইদাহ টাউনে গিয়ে সন্তর্পনে, অনেক কায়দা করে একটি ‘ক্যাপস্ট্যান’ ও একটি ‘মোর’ সিগারেটের শলাকা কিনে নিয়ে এসে বাড়িতে সাইকেল রেখে চলে গেলাম হুনাইন হাউসের ছাদে। ক্যাডেটরা তখন কেউ নেই। ছুটিতে। হুনাইন হাউসের পেছনে, কলেজের বাইরে মুরারিদহ গ্রাম। হাউসের সেই কিনারে গিয়ে অনভ্যস্ত হাতে, কয়েকবারের চেষ্টায় দেশলাই জ্বালিয়ে প্রথমে ক্যাপস্ট্যান ধরালাম। এক শলাকা দু’জন। সেদিন বাতাসের জোর ছিল। অবাক কান্ড! আমাদের কাশি-টাশি কিছুই হল না। তারপর ‘মোর’। ‘মোর’ একটু লম্বাটে সিগারেট। এখন ভাবলে অবাক লাগে যে ঝিনাইদাহ টাউনে সেই ’৭৯ সালেও ‘মোর’ পাওয়া যেত!
দু’রকম দু’টো সিগারেট টেনে মন ভরলো না…
আবার যেতে হবে ঝিনাইদাহ টাউনে…
[বাকীটা আরেকদিন বলবো] ++++
ক’দিন আগে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তামাকজাত পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ সংবাদ মাধ্যমে দেখে গল্পটি মনে পড়লো।

One Reply to “গল্পটি গর্বের নয়, তবে বলার মত”

  1. More দিয়ে আমারও শুরু ক্লাস সিক্স এ। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাস ইলেভেনে আপনার-আমার খায়বার হাউসের পেছনে পুকুর পাড়ে ক্লাসমেট ইকবালকে সাথে করে ১৯৮৮ সালে। সেই শুরু, শেষ হয় একটা ম্যাসিভ হার্ট এটাকের পর ২০১১ সালে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

মাসুদ রানা ও খালেদা বেগমকে সালাম

জনপদ, বিপর্যস্ত। করোনা কেমন যেন সবাইকে নিস্তেজ করে দিয়েছে। কেউ কারো কাছে যাচ্ছেন না, সামনা…