Photo: Prothom Alo newspaper

গাড়িমুক্ত দিন চাই

বিলেতসহ আরো অনেক দেশে সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষ সবার আগে চিন্তা করে সেদিনকার আবহাওয়া কেমন হবে। সারা দিন কি বৃষ্টি হবে? কখন হবে? ছাতি নিয়ে বেরুতে হবে কি? নাকি না? এমন অনেক কিছু। তাদের দিন কেটে যায় আকাশের দিকে তাকিয়ে। ঠিক তেমনি আমাদের দেশে আমরা চিন্তা করি, আজ কোন রাস্তা দিয়ে অফিস গেলে ট্রাফিকজট হবে না। ভোরে কাজের কথা ভাবব নাকি যানজটের চিন্তায় মগজ ভরিয়ে রাখব!

এ চিন্তাই আমাদের কাবু করে ফেলে। তারপর সারা দিন চলে আমাদের জট এড়িয়ে চলাচল করার যুদ্ধ।

আমাদের অনেক বিশেষজ্ঞ সারাক্ষণ হাজারো রকম করে ভাবছেন— কী করে যানজট দূর করা যায়, সমস্যাটি সমাধান করা যায়, প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে জনগণের বাহন আরো সুশৃঙ্খলভাবে চালানো যায়। কিন্তু দূর হচ্ছে না, সমস্যাটি দূর হচ্ছে না; বরং প্রতিদিনই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। রাস্তায়ই আমাদের দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে আমাদের সরকারও বেশ চিন্তা-ভাবনা করে কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারে না। মনে পড়ে, আমাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যানজট ও দূষণমুক্ত নগরের জন্য প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল, গাড়িমুক্ত দিনে কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি চালাবেন না।

তবে তার মনেও সংশয় ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস নিয়ে আমরা কাগজে লিখলাম, সুন্দর সুন্দর বক্তব্য দিলাম। বাস্তবতা যদি না থাকে, তাহলে এসব কথা বলে লাভ নেই। শুধু মুখে নয়, গাড়িমুক্ত দিবসের যথার্থতা আমরা যেন উপলব্ধি করি।’

মনে পড়ে, এর আগে ২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হক রাজধানীর বনানী ও মোহাম্মদপুরের দুটি সড়ক গাড়িমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গেল বছরের মার্চের মধ্যে মিরপুর-মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি এবং গুলশান-বনানী এলাকায় একটি সড়ক গাড়িমুক্ত করা হবে বলেও তিনি বলেছিলেন। এসব রাস্তায় তখন কেবল হেঁটে চলাচল করা যাবে। গাড়িমুক্ত করার জন্য নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন। গুলশান-বনানী এলাকায় বনানী সুপার মার্কেটের কাছের একটি সড়ক এজন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে রাস্তা খোঁজা হচ্ছিল।

গাড়িমুক্ত দিবস বা সড়কের কথা ভাবলেই বাংলাদেশের বাস্তবতার কথা মনে হয়। আমাদের বাস্তবতা সারা বিশ্বের চেয়ে অন্য রকম। আমাদের কাছে বিষয়টি ঠাট্টা মনে হয়। আমরা যারা আয়েশি জীবন পছন্দ করি, গাড়িদর্পে চলাচল করতে চাই, তারা হয়তো একটু রেগেও যাব। আমরা গাড়ি চেপে অফিস যেতে না পারলে আমাদের সম্মানহানি হতে পারে। আমার অর্থ আছে, আমি গাড়ি চড়ে কর্মস্থলে যাব, এতে কার কী?

বিশ্বের অনেক দেশে আবার ব্যাপারটি অন্য রকম। তারা এটিকে খুব সুন্দর একটি চিন্তা মনে করে। গাড়ি না চড়ে সাইকেল চেপে অফিসে যাওয়ায় তারা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়। একদিন গাড়ি ছাড়া থাকতে পারলে তারা খুশি হয়।

বরিস জনসন যখন লন্ডনের মেয়র ছিলেন, তিনি বলেছিলেন তার সরকার প্রতি রোববার দেশের রাজধানীতে গাড়িমুক্ত দিন হিসেবে পালন করার কথা ভাবছে। তিনি এ ধারণা পেয়েছিলেন জাকার্তা গিয়ে। প্রতি রোববার জাকার্তাবাসী তাদের গাড়ি বাড়িতে রেখে সাইকেল চেপে বা হেঁটে চলাচল করে।

লন্ডনে একসময় একটি ট্রাফিকমুক্ত দিন ছিল, যাকে বলা হতো ‘ভিআইপি দিন’; ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পেডেস্ট্রিয়ান দিবস। এটি লন্ডনের ‘ওয়েস্ট-এন্ড’-এ পালন করা হতো। তবে ২০১৩ সাল থেকে সেখানে গাড়ির ব্যবহার কমে যাওয়ায়, গাড়ি ছাড়া চলতে সবাই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায়, সরকার আবার সে রেওয়াজ বন্ধ করেছে। জনসন বলেছিলেন, তার শহরে গাড়িমুক্ততা বেশ জনপ্রিয় হবে।

ওদিকে জাকার্তার চিত্রটি মহাসুন্দর। রোববার সকালে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে পায়ে ভর করে। রাস্তাগুলো তখন ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত থাকে।

গাড়িমুক্ত দিবস এলেই থাইল্যান্ডের ব্যাংককে কিছু প্রধান সড়ক গাড়ি চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় যেন ওই রাস্তাগুলো দিয়ে সবাই সাইকেল চালিয়ে অথবা হেঁটে যাতায়াত করতে পারে। থাইল্যান্ডে প্রায় ৮০টি স্থানে গাড়িমুক্ত দিন পালন করা হয়। পত্রিকার খবরে বলা হচ্ছে যে, এর ফলে সেখানে যানজট কমে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং মানুষের জীবনের মান বেড়েছে অনেক। শহরবাসীদের ব্যাপারটি ভালোও লাগে।

সারা বিশ্বে সাধারণত ২২ সেপ্টেম্বর গাড়িমুক্ত দিন উদযাপন করা হয় এবং জনগণকে গাড়ি ছেড়ে অন্য কিছু ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া হয়। চীন মন দেয় কী করে মানুষের জীবনের মান বাড়ানো যায়, গাড়িমুক্ত দিনে রাস্তাগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়।

কোপেনহেগেন শহরে এমনিতেই ৬০ শতাংশ মানুষ তাদের প্রতিদিনের কাজে সাইকেল চড়ে বাইরে বের হয়। এমন অনেক দেশ আছে, সাইকেল জনপ্রিয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গাড়িমুক্ত দিন চালু করার আগে অবশ্য বেশকিছু বিকল্প চিন্তাও করে ফেলা প্রয়োজন। গাড়ি না থাকলে বয়স্ক মানুষ যারা হাঁটতে পারেন না, তারা কী করবেন? মানুষ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাবে কী করে? পণ্য পরিবহন কী করে হবে? রোগীরা হাসপাতালে যাবে কী করে?

ভেনিস শহরে পণ্য পরিবহনে খালপথ ব্যবহার করা হয়। তেমনি করেই প্রতি শহরের কিছু নিজের মতো করে বিকল্প পথ আছে কিংবা তৈরি হয়। যারা সাইকেল ব্যবহার করবে না, তারা মেট্রোরেলে চড়বে।

আমি এত কিছু বলছি তার কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশে একটি গাড়িমুক্ত দিবস এবং প্রতি শহরে গাড়িমুক্ত সড়ক খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা, চালকদের উন্মাদের মতো ব্যবহার ও শহুরে শিক্ষার অভাব মেটাতেই এ গাড়িমুক্ত দিন এবং এলাকা আমাদের জন্য প্রয়োজন।

ব্যাপারটি শুধু একদিনের জন্য নয়; চিন্তা করে
দেখুন, গাড়িগুলো যদি ঢাকায় একদিন না চলে, তাহলে কত অর্থ বেঁচে যাবে। গ্যাস বাঁচবে, তেল কম খরচ
হবে, কতটা কম কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস আমাদের বাতাসে নির্গত হবে এবং সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, অনেক মানুষের শারীরিক নড়াচড়া হবে; যা তারা সচরাচর করে না! অনেক মানুষ তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে চিন্তাভাবনা শুরু করবে। চিন্তা করুন তো সেদিন রিকশাচালকদের আয় কতটা বেড়ে যাবে! তারা কিছু অর্থ জমিয়ে রাখতে পারবেন।

গাড়িমুক্ত দিন আমাদের বিকল্প ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে সাহায্য করবে, চারপাশের পরিবেশ নিয়ে সজাগ করবে, নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে সজাগ করবে, গাড়ি ব্যবহারের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আমাদের সজাগ করবে এবং নিজেদের লোকালয়গুলোকে সুস্থ রাখতে উৎসাহ দেবে।

জনগণের সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমন দিন খুবই কাজে দিয়েছে। কী করে একটি টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা এবং চলমান রাখা যায়, সে বিষয়েও আমাদের শিক্ষিত করবে।

টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন বিশ্বে অনেক দেশে জোরালো হচ্ছে। তারা নিজেদের অবস্থান বুঝে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে। এই গেল সপ্তাহে রুয়ান্ডার কিগালি শহরে ও দুবাইয়ে গাড়িমুক্ত দিন পালন করেছে সেখানকার মানুষ।

অনেকেই হয়তো এমন দিন চাইবেন না এবং সমালোচনা করবেন। তবে বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা করলেই হয়তো বোঝা যাবে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মন্ত্রী মহোদয় বোধহয় ভুলেই গেছেন, তিনি গাড়িমুক্ত দিন চালু করার কথা বলেছিলেন। আমাদের মেয়র আনিস এ পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছেন। আবার কবে কোন মেয়র এসে এমন কথা আমাদের শোনাবেন কে জানে!

প্রথম প্রকাশঃ বনিক বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *