Photo: Ancient History Encyclopedia

তবুও মানুষ মানুষকে মারবে…

সংবাদ সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিবিসিকে আমার বেশ চিন্তাশীল মনে হয়। প্রায়ই তারা নতুন-নতুন বিষয় এবং ধারণার জন্ম দেয় তাদের দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদের জন্য।

সম্প্রতি বিবিসি ফিউচার তাদের “হোয়াট ইফ্…” পাতায় “যদি সব বন্দুকগুলো নেই হয়ে যায়” শিরোণামে একটি বিশ্লেষণ ছাপিয়েছে। লেখক র‍্যাচেল নুয়ের সারা পৃথিবীর বন্দুক এবং বন্দুক-সম্পর্কিত মৃত্যুর একটি চিত্র দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি আরো ভাবার চেষ্টা করেছেন যে এই বন্দুকগুলো পৃথিবী থেকে নেই করে দিলে কি হতে পারে।

বিশ্লেষণটি করতে গিয়ে তিনি এমন সব তথ্য দিয়েছেন যা আমরা বিশ্বের এ-প্রান্তে হয়তো নাও শুনে থাকতে পারি। আমরা অবাক হতে পারি। তিনি নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক বিশ্ববদ্যালয়ের মনোরোগ এবং আচরণ বিজ্ঞানের এক অধ্যাপক জেফরী সোয়ানসনের দেয়া তথ্য উল্যেখ করেছেন। অধ্যাপক জেফরী সোয়ানসন বলছেন যে আমেরিকায় প্রতিদিন ১০০ মানুষ মারা যান বন্দুকের গুলির আঘাতে। এক’শ জন? অবিশ্বাস্য মনে হয়। যে দেশের ভেতরে কোন যুদ্ধ নেই, মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে আছে, সেখানে প্রতিদিন ১০০ জনের মৃত্য হচ্ছে বন্দুকের গুলিতে!

তিনি আরো তথ্য দিয়েছেন। দু’হাজার বারো থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ৪৪,০০০ আমেরিকান আত্মহত্যা করেছেন যার মধ্যে অর্ধেক নিজেদের মেরেছেন আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে। প্রতি মাসে সেখানে ৫০ জন নারী মারা যাচ্ছেন তাদের স্বামী বা সহবাসকারীর বন্দুকের গুলিতে। সেখানকার পুলিশের গুলিতে বছরে মারা যাচ্ছেন প্রায় ১০০০ জন!

শুনতে অবাক লাগে বৈকি! এসব খবর আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকার আসে না। বিশ্বে অনেক সংবাদমাধ্যমেই আসে না। আমরা জানতেই পারি না সেখানকার পরিস্থিতি আসলে কেমন।

র‍্যাচেল নুয়ের তার বিশ্লেষণের শেষে বলছেন যে বিশ্ব এখনকার চেয়ে অনেক ভাল থাকতো যদি সব আগ্নেয়াস্ত্র হারিয়ে যেতো। তাহলে হয়তো এত মানুষ মারা যেতো না। তিনি হয়তো ঠিকই বলছেনঃ আগ্নেয়াস্ত্র না থাকলে এতো মৃত্যুর ঘটনা অবশ্যই ঘটতো না; মৃত্যুর হার অনেক কমে যেতো।

একই সাথে, তার কথা মেনে নিয়েই, বলা যায় যে আগ্নেয়াস্ত্র মানুষ খুন করে না; আসলে মানুষ মানুষকে খুন করে; আমরাই আমাদেরকে মেরে ফেলি। বন্দুক শুধু তার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বন্দুক, কামান, ট্যাংক, বোমা – এসব আমাদের হাতের অস্ত্র মাত্র। কাউকে মেরে ফেলার চিন্তা বন্দুকের মাথায় আসে না, আমাদের মস্তিস্ক থেকেই খুন করার চিন্তার উদ্রেক হয়।

মধ্যযুগে আমরা একজন আরেকজনকে মেরেছি কি করে? যুদ্ধ করেছি কি দিয়ে? তখন আমাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র হয়তো ছিল না, তবে আগুনতো ছিল।

এখন যদি আমাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র না থাকে তাহলে আমরা কি করবো? আমরা তলোয়ার, ছুরি-চাকু, তীর-ধনুক, বর্শা ইত্যাদির ব্যাবহার শুরু করবো; তাই নয় কি? বন্দুক আবিস্কারের আগে এসবই তো ছিল মারনাস্ত্র! আমরা এসব দিয়েই যুদ্ধ করতাম, এসব দিয়েই একজন আরেকজনকে মারতাম। একটি সামান্য দাড়ি চাঁছার ব্লেড দিয়েও একটি প্রানী মেরে ফেলা যায়।

শাস্ত্রমতে আমরা যতদূর জানতে পারি, কাবিলের হাতে তার ভাই হাবিলের খুন বোধহয় এই পৃথিবীর সর্বোপ্রথম হত্যা। তখন কাবিল তার ভাইকে কি দিয়ে মেরেছিল? পিস্তল দিয়ে নিশ্চয়ই নয়। হাবিলকে মারা হয়েছিল পাথর দিয়ে। তখন গাছের ডাল এবং পাথর ছাড়া আর কিছু ছিল না। কাবিল হাবিলকে কেন মেরেছিল তার কারণ খুঁজতে আমরা যাব না, তবে হাবিলকে মেরে ফেলা হয়েছিল এবং মানুষ একজন আরেকজনকে খুন করতে পারে তা বোঝা গিয়েছিল। কাবিল যদি প্রথম খুনটি না করতো, কেউ না কেউ অবশ্যই করতো তাও অনুমান করা যায়।

ইতিহাসের কিছু প্রাচীন সাম্রাজ্যকে আমরা ‘সভ্যতা’ বলে থাকি। কেন ‘সভ্যতা’ বলি আমি ঠিক বুঝি না, তবে ‘সভ্যতা’ হিসেবেই তাদের ব্র্যান্ডিং হয়েছে বেশ। যেমন ধরুন গ্রীক, রোমান, মায়ান – এসব তথাকথিত ‘সভ্যতা’ তাদের যুদ্ধজয় এবং সাম্রাজ্য গড়তে কত মানুষ হত্যা করেছিল তার সঠিক হিসেব এখন পাওয়া যায় না; ধারণা করা যায় শুধু। ট্রয়ের যুদ্ধ যদি সত্য হয়, তবে একিলীস একাই কত মানুষ মেরেছিল তা ভাবা যায়?

রোমান সাম্রাজ্যে অধিকারীরা যখন শেষ পর্যন্ত স্পার্টাকাসের বাহিনীকে পরাস্ত করতে পারলো, তখন রাতারাতি ৬,০০০ মানুষ মেরেছিল ক্রুসে বিদ্ধ করে। ইতিহাস ঘাঁটলে এমন সব গনহত্যার কথা জেনে ভয়ে শিহরিত হতে হয়। তাদের হাতে আগুন ছিল কিন্তু এখনকার ‘বন্দুক’ নামের যন্ত্রটি এবং বারুদ ছিল না। তবুও তারা লাখে-লাখে মানুষ মেরেছেন। আমরা এখনও সে’সব হত্যার জয়গান গাই, সে’সব নিয়ে সাহিত্য রচনা করি।

রোমান আমলে গ্ল্যাডিয়েটর’রা একজন আরেকজনকে কি দিয়ে মারতো। সাধারণ অস্ত্র দিয়ে। সে আমলের ‘দাস’দের মালিকেরা কেমন অস্ত্র দিয়ে তাদের দমিয়ে রাখতো? সাধারণ অস্ত্র দিয়ে।

আমরা, অর্থাৎ মানুষেররা চারিত্রিক ভাবে বিরোধ-মনোভাবাপন্ন্। আমাদের শক্তি ও চিন্তা দিয়ে অপরকে বেঁধে রাখতে চাই, দমিয়ে রাখতে চাই। কেউ যদি আমাদের না মানতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নিতে চাই। সেখান থেকেই বোধ হয় একজন আরেকজনকে মেরে ফেলার চিন্তা আসে। মস্তিস্ক-বিদ্যা নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা হয়তো আরো ভাল বলতে পারবেন।

ফিরে আসি আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ে। ধরুন, বর্মার সৈন্যরা রোহিঙ্গাদের ওপর যে অত্যাচার চালাচ্ছে, তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র না থাকলে কেমন করে তা করতো? সিরীয়ায় যারা যুদ্ধ করছে, আগ্নেয়াস্ত্র না থাকলে কি দিয়ে যুদ্ধ হত? তারা অবশ্যই যুদ্ধ করতেন, অত্যাচার করতেন – শুধু বন্দুক বা বোমা ব্যবহার করতেন না। মানুষ তাদের হাতে মারা যেতোই।

আমাদের বাংলাদেশে আগ্নেয়াস্ত্র না থাকলে আমরা কি করতাম? ছিনতাইকারী কি দিয়ে আক্রমন করতো? রাজনৈতিক পক্ষরা কি দিয়ে হানাহানি করতো? আমাদের ছিনতাইকারীরা ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে কি করে মানুষের চোখে বিশাক্ত মলম ডলে দিয়ে তার সবকিছু কেড়ে নেয়া যায়। জমিজমা নিয়ে বিরোধকারীরা দেখিয়েছে কি করে লম্বা-লম্বা দা-কুড়াল নিয়ে রক্তারক্তি করা যায়। ধর্ষণকারীরা দেখিয়ে দিয়েছে কি করে বন্দুক ব্যবহার না করেও অত্যাচারের পর মানুষকে মেরে ফেলা যায়। আমরা বহুকাল ধরে হকিষ্টিক দিয়ে পারপিট করেছি; মানুষ মারাও গিয়েছে সে’সব আঘাতে।

তো বোঝা যাচ্ছে যে আগ্নেয়াস্ত্র না থাকলেও মানুষ মানুষকে খুন করবে। শুধু তার মাত্রাটি হয়তো কমে আসবে। গুলির আঘাতের পর বেঁচে থাকার সুযোগ ছুরির আঘাতে পর বাঁচার সুযোগের চেয়ে কম। ছুরির আঘাতের পরো বাঁচা যায়, তবে বন্দুকের গুলির আঘাত বেশিরভাগ সময়ই মৃত্যু ঘটায়।

আগ্নেয়াস্ত্রহীন বিশ্বের কথা ভাবা এখন একটি অলীক চিন্তা। আজকের বাস্তবতায় তা হয়তো সম্ভব নয়। মানুষ এখন মানুষ মারবে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েই।

তবে অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি তাদের বন্দুকগুলো ধ্বংস করে দেখিয়ে দিয়েছে কি করে আগ্নেয়াস্ত্র-সম্পর্কিত মৃত্যু কমানো যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে তা সম্ভব কিনা তা অনেক ভাবনা-চিনার প্রয়োজন। আমাদের দেশের অস্ত্র আইন অনেক পুরনো। বিলেতিরা আমাদের মারার জন্য যেসব অস্ত্র আইন তৈরী করে রেখে গিয়েছিল তাই এখনও চলছে। এই আইনগুলো যদি আমাদের মত করে সংশোধন করা যায়, তাহলে হয়তো এদেশেও আগ্নেয়াস্ত্র-সম্পর্কিত মৃত্যর হার কমে যেত।

তারপরও কি মানুষ মানুষকে মারবে না? হয়তো কম মারবে, তবুও মানুষের হাতেই মানুষের মৃ্র ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *