Categories
Blog

দাদীবাড়ির হারিকেন, হ্যাজাক বাতি ও আজগর ভাই

দাদা এগিয়ে গিয়েছিলেন ১৯৪১ সালে যখন বাবাই তিন বছরের শিশু। আমার দাদা-দাদীর দশজন নাতনী ও দশজন নাতি। কেউ দাদাকে দেখেনি। আমাদের মনে দাদা ছিলেন না। ছিলেন দাদী – জোবেদা খাতুন। তবে দাদীর গল্প বলতে চাই না। এ গল্প ‘দাদীবাড়ির’।
আমরা থাকতাম দাদীবাড়ি থেকে বাইশ মাইল দূরে – ঝিনাইদাহ’তে। মাসে একবার বা দু’মাসে একবার সেখানে যেতাম। দাদীবাড়িতে সত্তুরের দশকে বিদ্যুৎ ছিল না। বৈদ্যুতিক পাখা নেই, বাতি নেই। সন্ধ্যে হলেই আমরা যে ঘরে থাকতাম, সেখানে দু’টি হারিকেন দিয়ে যেতেন আমাদের বড় চাচার ছোট ছেলে – আজগর ভাই।
আজগর ভাই আমার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়।
একবার গিয়েছি। মনে হয় শীতকাল। ভাল মনে নেই।
আমার সাত কি আট বছর। দূপুরের শেষ বা বিকেলের প্রথম রোদে কেন যেন বাড়ির রোয়াকে গিয়েছি। দেখি আজগর ভাই হারিকেন [আমরা বলতাম ‘হেরিকেন’] ও হ্যাজাক বাতি নিয়ে বসেছেন – কাপড় দিয়ে মুছছেন। জীবনে এতোগুলো হারিকেন আমি আগে দেখিনি। আমাদের ঝিনাইদাহ’র বাড়িতে তিন’টি হারিকেন ছিল। হ্যাজাক বাতি দেখেছি মা’র সাথে ঝিনাইদাহ শহরে মেলায় গিয়ে [মেলাকে তখন এক্সিবিশান বলা হতো]।
গুনে দেখি আজগর ভাই সতেরোটি হারিকেন এবং ছয়টি হ্যাজাক বাতি নিয়ে বসেছেন। পরিস্কার করছেন। সব হারিকেনগুলোর কাঁচের ভেতরের দিকে কালি পড়েছে – গেল রাতে সারারাত জ্বলে। হ্যাজাক বাতিগুলোর অবস্থা তার চেয়ে ভাল।
তবে আমাদের আজগর ভাই এই সতেরোটা হারিকেনের কাঁচ এবং ছয়টি হ্যাজাকের কাঁচ প্রতি বিকেলে মুছে প্রতি রাতে জ্বলার জন্যে প্রস্তুত করেন।
আজগর ভাই’য়ের জন্যে আমার এক ধরণের ভালবাসা জন্মে গেল। তার কোন ক্লান্তি নেই। প্রতি বিকেলে এই একই কাজ তিনি করে যাচ্ছেন। একটু দাঁড়িয়েই বুঝলাম তিনি কোরানের সুরাগুলো গানের সুরে গাচ্ছেন এবং কাজ করে যাচ্ছেন। নামাজের আজানও তিনি বেশ জোরে-জোরে গানের সুরে গেয়ে হারিকেন আর হ্যাজাকের কালি মুছে যাচ্ছেন।
সেদিন আমায় দেখে মজা পেলেন। বললেন, “এই কবীর; বল’তো, আস-সলাতু খাইরুম মিনান নাউম মানে কি?”
আমি বলি, “নিদ্রা হইতে নামাজ উত্তম”।
“ধুরও; তুই ভুল জানিস। এটা আসলে হবে ‘নামাজ হইতে নিদ্রা উত্তম’।“
আমি বুঝেছিলাম তিনি মজা করছেন। তবে তার এই একাগ্রতা আমার আজও মনে আছে।
সতেরোটা হারিকেন এবং ছয়টি হ্যাজাক বাতি যিনি প্রতি বিকেলে পরিস্কার করতে পারেন তাকে চিরদিনের জন্য পছন্দ করা যায়।
[অনেক বানান ভুল হলো; ক্ষমা চাই]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *