Photo: Google

ভেবেছিলাম এই লেখাটির নাম দেব এইসব দিনরাত্রি। অনেকের সাথে আলাপও করলাম। বন্ধুদের কাছে জানতে চাইলামঃ ‘কোন এক লেখকের কোন এক উপন্যাস, গল্প অথবা কলামের নামে অন্য কেউ কি লিখতে পারবেন? ধরুন হ্যামলেট লিখেছিলেন শেক্সপিয়ার। হ্যামলেট নামে আর কেউই কি লিখতে পারবেনই না?’

অনেকে উত্তর দিল লেখা যাবে, আবার অনেকে জানালো উচিৎ হবে না। ঠিক করলাম এইসব দিনরাত্রি শিরোণামে লিখব না। হুমায়ুন আহমেদের একটি জনপ্রিয় নাটক ছিল এই নামে। বন্ধু শাকুর মজিদ জানালেন তাঁর আগে কবি জীবনানন্দ দাস। বন্ধু ইশতিয়াক রেজা জানালেন কেউ একজন এইসব দিনরাত্রি নামে একটি নিয়মিত কলাম লিখতেন কোন এক কাগজে। তারপরও ভাবলাম এইসব দিনরাত্রি নামে নাই বা লিখি। বদলে দেই নামটি। নাম দিয়েছি আমাদের সব দিনরাত্রি। ধারণাটি মাথায় এসেছিল এক শুক্রবার সকালে।

গিয়েছি মায়ের কবরের কাছে। প্রতি শুক্রবার সকালেই যাই। এবারও। ঢাকার গুলশানের দু’নম্বরে গুলশান সোসাইটির মসজিদের পাশ দিয়ে বনানী কবরস্থানে ঢোকা যায়। ছোট্ট একটি দরজা। মায়ের কবর সেই দরজার খুব কাছেই। যদি কবরস্থানের সদর দরজা দিয়ে আসতে চাই, তাহলে অনেক খানি হাঁটতে হয়। কষ্ট করতে চাই না, তাই সদর ফটক দিয়ে ঢুকি না। গুলশানের ঐ ছোট্ট দরজা দিয়েই সেখানে যাই।
এই বিশেষ শুক্রবার সেখানে গিয়ে দেখি এক ক্ষমতাবানের রক্ষী সেখানে দাঁড়িয়ে। বললোঃ ‘স্যার এখান দিয়ে যাওয়া যাবে না; ঘুরে যেতে হবে।’

জানতে চাইলামঃ ‘কেন?’

সে বললেঃ ‘স্যারের বাবা মারা গেছেন; তাঁর দাফন হবে বিকেলে; তাই তিনি এ’পথ দিয়ে ঢোকা বন্ধ করেছেন’।

‘তাই বলে এই সকালে?’

‘আমি জানি না, স্যার; হুকুম!’

রাগে মনে হল শরীরের লাল রক্ত কালো হয়ে গেল। তারপরও মাথা ঠান্ডা রেখে, নত করে নিজের সাথে বিড়-বিড় করতে করতে সেখান থেকে চলে এলাম। ভাবলাম পরের শুক্রবার যাবো।

অপমানিত হলাম। এই ক্ষমতাবান বেতন পান গণমানুষের করের অর্থে। আমরা দেই। আর তিনি আমাদের কবরাস্থানে ঢুঁকতে দেন না। কাগজেই দেখেছিলাম তাঁর বাবার মৃত্যুর কথা; মনে-মনে অনেক দোয়াও করেছিলাম। কিন্তু এ’ঘটনার পর সব দোয়া মন থেকে উবে গেল। কষ্ট করে বেশিদূর হেঁটে যেতে হবে সে কারণে অপমানিত হলাম না, অপমানিত হলাম এই ভেবে যে আমার স্বাধীনতা চিড়িয়াখানার প্রানীদের মত খর্ব করা হলো; আমার মুখের ওপর দুড়ুম করে একটি কপাট ফেলে দেয়া হলো!

আমিই বা কেমন মানুষ! যাঁর জন্যে ক’দিন আগেই দোয়া মাগলাম, তা আজ আবার ফিরিয়ে নিলাম! আসলে আমরা সবাই স্বার্থের কাঙ্গাল, ক্ষমতার কাঙ্গাল; যেখানে স্বার্থ, সেখানেই আমাদের চিড়ে ভেজে। দোয়া ফিরিয়ে নিলাম কেন? আমার স্বার্থে আঘাত লেগেছে, তাই। তাহলে কি স্বাধীনতাও এক রকমের স্বার্থ?
আমরা আসলে এতো খারাপ না। অন্যের স্বার্থেও আমাদের মন কাঁদে। দেখুন না, ক’দিন আগে কারওয়ান বাজারে রাজিব হোসেনের ডান হাত তার শরীর থেকে খষে গিয়ে দুটি বাসের মাঝে ঝুলছিল। আমরা জানতে পেরেছিলাম পত্রিকায় ছবি দেখে। প্রায় দু’বছর আগে য্যেষ্ঠ সাংবাদিক জগলুল আহমেদ চৌধুরীও বাস থেকে নামতে গিয়ে আরেকটি বাসের নীচে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তখন কোন সাংবাদিক এ নিয়ে তেমন কোন কথা বলেন নি। আজ সবাই হয়তো ভুলেই গেছেন জগলুল ভাইকে। আজও যখন রাজিবের ছিন্ন হাতের প্রসঙ্গ আসে, কেউ জগলুল ভাইয়ের কথা বলেন না। কেউ মনেও করেন না তাঁকে। রাজিবের কথাও আজকাল কেউ বলেন না। যেন জগলুল নামে, রাজিব নামে – কেউ কখনও ছিলই না।

আমরা সবাই এখন ব্যাস্ত মাদক নিয়ে, মাদক ব্যাবসায়ীদের নিয়ে। আমাদের আজ নতুন কাজ আবিস্কার হয়েছে। আমরা পুরনো সব কিছু ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাবো? কিন্তু মাদকাসক্তির ফলে যাদের জীবন যায়-যায়, তাদের নিয়ে কেউ কোন কথা বলছে না। তারা কারা? তাদের কেমন করে সুস্থ্য করা যাবে, সেই পথ কেউ দেখাচ্ছেন না। শুধুই বলছেন মাদক নির্মূল করতে হবে। এবং সে’কারণে অনেক মাদক-বিক্রেতা পুলিশের সাথে বন্দুক-যুদ্ধে মারা যাচ্ছেন। কই, কোন মাদক আমদানিকারক কি এখন পর্যন্ত মারা গেছে? মাদক ব্যবসা আজকের নয়; বহু বছর ধরে চলছে। চালাচ্ছে কারা? রাস্তায়-রাস্তায় যারা বিক্রি করে বেড়ায়, তারা? নাকি ঘরে বসে যারা মাদকের বাজার তৈরী করে, তারা? তাদের কি হবে? বিদেশে ছুটি কাটাতে যাবেন? কোন এক সমুদ্র সৈকতে? অথবা মক্কা-মদীনায় ওমরা করতে?

বোঝা ভার। কাকে একটু অপরাধ করলেই মেরে ফেলি আর কাকে হাজার অপরাধ করলেও বাঁচিয়ে দেই – তা আমাদের মত সাধারণ মানুষ বুঝেও বুঝি না।

আসলে ভাল থাকার জন্যে, সুখী জীবনের জন্যে সব কিছু বুঝতে নেই। সব কিছু জানতে নেই। আদম ও হাওয়ার গল্প মনে নেই? তারা জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে জানার শক্তি আয়ত্ত করার পরই তাদের জীবনে অ-সুখের খড়গ নেমে এলো?! জ্ঞানবিহীন অবস্থায়ই তারা সুখী ছিলেন।

কিন্তু ঐ সাত বছরে শিশুটি – সেও’তো কিছু জানতো না; কিছুই না; সে তার শিশু-দৃষ্টি দিয়ে এক আলোকিত পৃথিবী দেখতো। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলো একদল পশু তার শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে, তাকে খুন করে মাংসের দলায় পরিণত করে ডোবার ভেতর ফেলে দিয়ে চলে গেল। মৃত্যুর ঠিক আগে-আগে এই অত্যাচার চলাকালীন মেয়েটি জানা শুরু করলো, বোঝা শুরু করলো কেন পশুগুলো তাকে ছিন্নভিন্ন করছে, কেন মেরে ফেলছে। সাত বছরের জীবনে এই শিশুটি যে প্রকান্ড জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছিল তা আদম এবং হাওয়া তাদের সারা জীবনে অর্জন করেছিলেন কিনা তা আমাদের জানা নেই। না জানলেই বা কি! এটুকু জানি যে তারা দু’জন জ্ঞানের এক বিশাল বংশের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। এই বংশটিই এখন জ্ঞান ও অজ্ঞানের মহারাজা। এই বংশের অঙ্গুলির নির্দেশেই জ্ঞানী হওয়া যায় এবং জ্ঞানশূন্য হওয়া যায়।

ফিরে আসি শুক্রবারে।
বাজার করার শেষ লগ্নে ঢুঁকি গুলশান দুই নম্বর সেকশনের সিটি কর্পোরেশন বাজারে সেখানে পৌঁছুতেই আমার সামনে এসে দাঁড়ায় প্রায় দশ-বারো বছরের একটি ছেলে। দেখে বয়স তাইই মনে হয়। ময়লা সাদা স্যান্ডো-গেঞ্জি পরা। ছেলেটির দুটি হাতই নেই। কাঁধ থেকে ঝুলে আছে চার-ইঞ্চি সমান বাহু। আর কিছু নেই। কনুই নেই, হাত নেই, আঙ্গুল নেই। গলায় ঝুলছে একটি ছোট্ট টাকার থলি। মানুষের ভিক্ষের অর্থ জমা হবে তার ভেতর। এক’শ টাকা তার থলির ভেতর রাখি।

একটু ভাল করে তাকাই তার দিকে। দুর্ঘটনা ঘটেছিল? দুর্ঘটনায় এমন করে দু’হাতই চলে গেল?

জানতে চাইঃ ‘তোমার নাম কি বাবা?’

সে বলেঃ ‘রাসেল।‘

‘তোমার হাতে কি হয়েছিল?’

‘সৎ-বাপ আমার হাত কাইট্টা দিসিলো।‘

মনে হলো আর জানতে চাওয়া বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। তারপরও প্রশ্ন করিঃ ‘তিনি এখন কোথায়? কি করেন?’

‘সে এখন জেলে।‘ রাসেল জানায়।

আমি আর কথা বলি না। তবে তাকে টাকা দিয়ে আমার মন ভাল হয়। কবরস্থানে ঢুকতে না পারার দুঃখ একটু মোচন হয়। প্রায় ভুলেই যেই যে আমায় ঢুকতে দেয় নি। রাসেলের দুঃখের কাছে আমার কষ্ট অতি সামান্য। কিছুক্ষণ রাসেলকে নিয়ে ভাবি। কেমন পরিস্থিতিতে রাসেলের সৎ বাবা তার হাতে কোপ মেরেছিল? এতো ছোট একটি ছেলেকে তার মারতে ইচ্ছে হয়েছিল কেন? আচ্ছা না হয় পেটালোই; তাই বলে কোপ মেরে হাত ছিন্ন করে দিল? দুই হাতই? রাসেলই কি আমায় সত্যি বললো? আমাদের শহরে ভিক্ষুকরা তো প্রায় সবাই অভিনয় করে, নানা রকমের শারীরিক ও মানসিক অভিনয়। রাসেলও কি বানিয়ে গল্প বলে যাচ্ছে বেশি-বেশি ভিক্ষে পাওয়ার জন্যে? হতেও পারে।

আমার মনেই বা এমন প্রশ্ন আসছে কেন? ছেলেটির কথা পুরোপুরি আমি বিশ্বাস করছি না কেন? আমার কি হয়েছে? আমাদের কি হয়েছে? আমরা কারো কথা, কারো বর্ণনা সরাসরি বিশ্বাস করি না কেন? নাকি করতে পারি না? নাকি কালের খেয়ায় আমাদের ভেতর থেকে মানুষকে বিশ্বাস করার চর্চাটি উধাও হয়ে গেছে?
এসব চিন্তা করতে করতে এই শুক্রবারের বাজার করা আমার ভাল হয় না। সাধারণত বাজার করে আমি যে আনন্দ পাই, আজ তা পাই না। সারা সপ্তাহ উদ্ভ্রান্তের মত ছোটাছুটি করে, আপিসের সঙ্কট মোকাবেলা করে, শুক্রবার এলে মনে হয় দিনটি কিছুটা নির্ভার যাবে; হয়তো কোন সঙ্কটে পড়বো না; দিনটি আমার মত করে কাটবে। অন্যের ইচ্ছায় নয়। অপরের ইচ্ছায় অন্য দিনগুলো কাটুক; শুক্রবারটি আমার ইচ্ছায়। এদিন কেউ আমার মন খারাপ করে দেবে না, দিনটিকে বড় করার জন্য আরো সকালে ঘুম থেকে উঠবো, লিখতে বসবো, কবরস্থানে গিয়ে কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে বেশ-কিছুক্ষণ দাঁড়াবো, সেখান থেকে বাজার-সদাই করতে যাবো, বাজার গোছাতে সাহায্য করবো, শুক্রবাসরীয় কাগজের সাহিত্য-পাতাগুলো পড়তে-পড়তে নামাজের সময় হবে, নামাজ পড়ে সবার সাথে দুপুরের খাবার। কোথাও বেড়াতে যাবো বা বাড়িতেই থাকবো। সে আমার ও আমাদের ইচ্ছে। এ শহরে বেড়ানোরই’বা জায়গা কোথায়? বেড়ানোর অর্থই হচ্ছে কোন এক ঘুপচি রেস্তোরাঁয় গিয়ে গপ্-গপ্ করে গিলতে-গিলতে অন্যদের স্ট্যাটাসের দিকে চিরন্তন তাকিয়ে থাকা, কিছু রসনা-বিলাসের ছবি সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে সবাইকে জানানো এবং কয়েকটি নিজদের হাসি-মুখ ছবি তুলে ‘চেক-ইন্’ দেয়া। আমি রেস্তোরাঁয় গিয়ে নিজে চারিদিকে তাকিয়ে দেখেছি; সত্যিই তাই হয়।
তারপরও দিনটি নিজের মত কাটে না। গিন্নী গোসলখানার কল সারানোর মিস্ত্রীকে ঠিক আজকেই আসতে বলে দিয়েছে এবং তার কাজ তদারকির দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। এই কল-মিস্ত্রীর সাথে চলে যায় এক ঘন্টা। এদিকে আমার পার্কে গিয়ে ক্যালোরি কমানোর সময় চলে যাচ্ছে। যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথে মনে হয় দেখিই না একবার অন্যদের স্ট্যাটাসে কি কি আছে। মিনিটখানেকের জন্যে বসে যাই ল্যাপটপে। খুলতেই দেখি বন্ধু শাকুর বার্তা পাঠিয়েছে ‘ইনবক্সে’ তার বিবাহ-বার্ষিকীতে আমন্ত্রন জানিয়ে। ‘ইলেক্ট্রনিক’ আমন্ত্রন। ‘ইলেক্ট্রনিক’ শব্দের বাংলা কি হবে এখন ঠিক মনে আসছে না, তবে আমি শাকুরের কাছ থেকে ‘ইলেক্ট্রনিক’ আমন্ত্রন আশা করি নি। মনে হয়, ‘সে আমায় একটি ফোন তো করতে পারতো!’ ‘ইলেক্ট্রনিক’ আমন্ত্রন সত্ত্বেও ওর ওখানে যেতাম, কিন্তু আপিসের এক অমোঘ কাজ সেই সন্ধ্যায়ই সময় ফুড়ে আসতেই হলো। যাওয়া হয় নি। শাকুরকে বলা হয় নি আমি তার আমন্ত্রনে যেতে চেয়েছিলাম। আপিস তো আপিসই; একে উপেক্ষা করে কার সাধ্য!?
আমাদের সব দিনরাত্রিগুলো কেমন যেন। নিজের ইচ্ছের কাছে জিতে যায়। সবসময়ই কিছু-না-কিছু অন্যের জন্যে করার আছে, নিজের জন্যে নেই। আমার জন্যে কবরাস্থানের পথ নির্বিঘ্ন নয়, আমি ‘স্যার’এর দয়ার ওপর নির্ভরশীল। রাসেল তার বাবার ছুরির কোপের পর মিথ্যা-অমিথ্যায় ভিক্ষে করবে। আমাদের পরিবার নিয়ে বেড়াতে গিয়ে একে-অপরের দিকে তাকাবে না। শাকুর আমায় ‘ইলেক্ট্রনিক’ আমন্ত্রন জানাবে। এই সবই হবে আমাদের দিনরাত্রি।

ইকরাম কবীর নিজেকে গল্পকার ভাবতে ভালবাসেন; তিনি তা নাও হতে পারেন। ​

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

An impending health disaster

The news has come as a bad piece. Extremely bad. It’s an impending disaster for all of us.…