প্রৌঢ়তা

কাঁচের স্লাইড সরিয়ে মেয়েটি এক লাফে দোকানের ভেতর ঢুঁকে পড়বে অসিত প্রামানিক ভাবতেই পারে নি। দুপুর বেলা তেমন ক্ষদ্দেরের ভিড় থাকে না। আজও নেই। দোকানের চেয়ারগুলোর পেছনে রাখা বেঞ্চে বসে খবরের কাগজটি কেবল হাতে নিয়েছে। দরজার পানে মুখ দিয়ে বসে। তার বয়সী একজন ক্ষদ্দের দাড়ি চাঁছাতে এসেছিলেন তাকে নিমাই এর হাতে দিয়ে দিয়েছে। নিমাই শেভ করা শেষ করে তার শরীর মালিশ করে দিচ্ছে। ভদ্রলোক চোখ বুঁজে রয়েছেন। দেখে মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছেন। অনেকে এমন অবস্থায় নাক ডাকতে শুরু করেন। আশেপাশের অন্যান্য দোকানেও ক্রেতা না থাকায় তেমন হৈ-হুল্লোড়ও শোনা যাচ্ছে না। দু’একজন মাঝে-মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছে। তাও ম্রিয়মান। তার সেলুনে সাধারণত মহিলারা আসেন তাদের সাত-আট বছরের ছেলেদের চুল কাটাতে। তবে মায়েরা এমন দুপুরে কেউ আসেন না। পড়ন্ত বিকেল তাদের জন্যে সুবিধের সময়। বড়ষি ছোঁড়ার সময় ছিপ যেমন ঝাঁপ দিয়ে পানির দিকে সাঁই করে ধেয়ে যায়, মেয়েটিও ঠিক তেমন করেই তার দোকানে ঢুঁকলো। প্রস্তুত ছিল না অসিত। বারো বছর ধরে সে এই দোকান চালাচ্ছে। এই প্রথম এই বয়েসের একটি মেয়ে তার দোকানে এল; তাও আবার ঝম লাফিয়ে।

ভাল করে তাকিয়ে দেখার আগেই মেয়েটি রিনিঝিনি কন্ঠে জানতে চায়ঃ ‘মামা, আপনার এখানে চুল কাটানো যাবে তো?’

এবার একটু ভাল করে তাকায় অসিত। ধোঁয়ার কুন্ডুলীর মত ঝাঁকড়া চুল; ঝুলে থাকে কুন্ডুলীগুলো লম্বা কানের দুলের মত লাফাচ্ছে; চুলের ওপরভাগে হালকা ব্লীচ্ করা; সাদাটে-শ্যামলা গায়ের রঙ; নীল রঙের প্যান্টের সঙ্গে আসমানী ফতুয়া। ওড়না নেই, উঁচু বুকটি প্রায় তার দিকে শাপের মত ফণা তুলে আছে বলে মনে হয়। কোন দিঘির টলটলে পানির নীচে যেমন শেওলার ছায়া দেখা যায় তেমনটিই মেয়েটির ফতুয়ার নীচে অন্তঃবাসের হালকা চিন্হ ফুটে উঠেছে। অপ্রস্তুত অবস্থায়ও তা দেখে ফেলে অসিত। মেয়েটি বুঝতে পেরেছে কিনা ঠিক বুঝতে পারে না। বুঝতে পারলে বোধহয় আরো অপ্রস্তুত হতো।

‘কার চুল কাটাবেন, দিদি?’ জানতে চায় অসিত।

‘আমিই; আমিই কাটাবো, সময় নেই; এখন পার্লারে যাওয়ার সময় নেই; ওখানে ওনেক লম্বা কিউ, বুচ্ছেন মামা; আসেন, কাটেন; আমি বলে দিচ্ছি কিভাবে কাটবেন; বেশি কিছু করতে হবে না। সিম্পল্।‘

বলেই একটি খালি চেয়ারে সে বসে পড়ে।

স্তম্ভিত হয় অসিত। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এ পেষায় কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু এই বয়সের মেয়ের চুল সে কখনোই কাটে নি সে। দশ-এগারো বছরের মেয়েদের মায়েরা তাদের সন্তানদের চুল কাটাতে মাঝে মাঝে তার কাছে নিয়ে আসেন, তাও এখন খুব কম। এখন সব বয়সের মেয়েরাই পার্লারে যায়। সারা শহর জুড়ে ঘাসের মত বিউটি পার্লার গজিয়েছে।

‘এই মেয়ের হয়েছেটা কি?’ ভাবে অসিত। ‘মাথা খারাপ!’ তা’নাহলে এমন পুরুষ-সর্বস্ব এক হেয়ার-কাটিং সেলুনে এই জমানার তেইশ-চব্বিশ বছরের মেয়ে চুল কাটাতে আসে! কি করবে ভেবে পায় না। মেয়েটি ততক্ষণে বলতে শুরু করেছে তার চুলে কিভাবে কাঁচি চালাতে হবে। এমন মেয়েদের চুল কাটতে সে তো কখনও শেখে নি। তেমন যন্ত্রপাতিও তার কাছে নেই। প্রয়োজন হয় না। কারো চুল কাটতে হলে কাস্টমারের গায়ে যেমন এক ফালি কাপড় পেঁচিয়ে দিতে হয়, তেমন পরিষ্কার কাপড়ও তার কাছে নেই। ছেলেদের গায়ে একটা ভাঁজ করা ময়লা অথবা আধ-ময়লা কাপড় জড়িয়ে দিলেই হয়। কিন্তু এমন একজন মেয়ের গায়ে কি তুলে দেবে তা একেবারেই বুঝে উঠতে পারে না।

‘আজকের দিনটা এমন কেন?’ ভাবে সে। অভ্যাসের বাইরে, প্রস্তুতির বাইরে – প্রতিদিনের বাইরে অচেনা একটি দিন। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে ধনী ঘরের মেয়ে। ময়লা কাপড় দেয়ই বা কেমন করে। যদি কোন কথা শুনিয়ে দেয়! তখন মান-সন্মান কোথায় যাবে?

নাহ! মেয়েটির চুল কাটতে তার ইচ্ছে করছে না।

‘ওয়া-স-সাপ্, মামা! আপনি শুনতে পাচ্ছেন না আমি এতো কথা বলে যাচ্ছি?’

‘দিদি, আপনার গায়ে জড়ানোর জন্যে পরিষ্কার কাপড় আমার কাছে নেই’, সবিনয়ে বলে অসিত।

মেয়েটি হেসে বলে, ‘গায়ে কিছু দিতে হবে না, মামা; বেশি কিছু’তো না; একটু ছেঁটে দিলেই চলবে।‘ চুলে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলে, ‘এইযে, এখানে দেখছেন, এগুলো কেটে দিলেই হবে’। এ কথা বলে সে হাতের ফোন ও কানের হেডফোন সামনে ঢাউশ আয়নার সামনে রাখে। ফোনের দিকে তাকিয়ে অসিত সেটার দাম বোঝার চেষ্টা করে। ইদানিং সে আই-ফোন আর অন্যান্য স্মার্ট ফোন চিনতে শিখেছে। মেয়েটি কাছে আই-ফোন। বেশিক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার অসিতের ফুসরত নেই; মেয়েটি উসখুস করছে; তাড়াতাড়ি কাটতে হবে। আয়নার সামনে রাখা চিরুনি-কাঁচি হাতে নিয়ে চুলের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে।

অসিত লম্বায় খুব উঁচু নয়। সে কারণেই মেয়েটি বসে থাকলেও তার চুলগুলো, অসিতের চোখ-নাখ-মুখের অনেক কাছে। চুল থেকে অদ্ভুৎ এক গন্ধ তার নাকে এসে ঢুঁকছে। চোখ একবার বন্ধ করে গন্ধের আস্বাদটা নিয়ে আবার তাকায় সে। সেই মুহুর্তেই মেয়েটির বোতাম-খোলা ফতুয়ার ওপরভাগে চোখ চলে যায়; সবগুলো বোতাম লাগানো নয় ফলে তার বুকের খাঁজটি একটি খালের মত কোন এক বনের গহীনে চলে গেছে বলে মনে হয়। সেখানেই মেয়েটির স্তন দু’টো ফেঁপে রয়েছে। অসিত চোখ ফেরাতে পারে না।

তবে নিজেকে সামলে নেয় সে। আবারও বলে, ‘দিদি, আমার কাছে একটা পরিস্কার তোয়ালে আছে; গায়ের ওপর চাপিয়ে দেই; চুল পড়তে পারে।‘

তার জোরজারী দেখে মেয়েটি মাথা নেড়ে বলে, ‘দেন, তবে মামা, তাড়াতাড়ি করেন; যেতে হবে এক যায়গায়।‘

অসিত দ্রুত পেছনের দেয়ালে আলমীরা খুলে ধোয়া একটি সাদা তোয়ালে তার বুকের ওপর মেলে দিয়ে দু’কিনার ঘাড়ের ওপর ফেলে রাখে। ভাবে, যাক বাবা! ও দৃশ্য আর দেখতে হবে না।

চুল কাটায় মন দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু চুল থেকে ভেসে আসা গন্ধ তো আর রুখতে পারে না। নাক দিয়ে ঢুঁকে মস্তিস্কের সমস্ত অঞ্চলগুলো ভরিয়ে দিয়ে এক কোনে বৃষ্টিপাতোন্মুখ একগুচ্ছ মেঘের মত জমাট বেঁধে থাকে। ইচ্ছে হয় ভিজে যাওয়া বেড়ালের মত মাথা ঝাড়া দিতে। কিন্তু তাতেও কি এই মেঘ কাটবে? মনে হয় মেয়েটির সাথে কথা বলে মেঘের দলা বের করে দেয়। কিন্তু আবার গন্ধ হারিয়ে যায় সে ভয়ে আর কথা বলে না। অসিত সন্তর্পনে কাঁচি চালায়। মেয়েটি হাত তুলে দেখিয়ে দেয়। চোখ বড়-বড় করে চুলের দিকে ভাল করে তাকায়। ভুল করা যাবে না; মেয়েটিকে হতাশ করা যাবে না; সুন্দর করে কাটতে হবে। তবুও তার কেশের সুগন্ধ তার মাথা থেকে বেরোয় না।

কিছুক্ষণের জন্য অন্য কোথাও হারিয়ে যায় অসিত। অনভ্যস্থ কোথাও।

অনেক বছর আগে আয়ুশির চুলেও এমন গন্ধ ছিল। আয়ুশিকে তার এমন শ্যাম্পু দেয়ার মুরোদ ছিল না; সস্তা দরের গায়ে মাখার সাবান আর শরষের তেল মাখতো; তারপরও তার কেশেও এমনই সুবাস ছিল। একবার’তো সে সারারাত বৌয়ের চুলে মুখ ডুবিয়ে রেখেছিল। আয়ুশি কি খুশি! তারও অনেকদিন পরে বলেছিল সে’রাতে সারারাত নিজেকে রাজরাণী মনে হয়েছিল। সকল রমণীর কেশেই’কি একই সুবাস থাকে? ভাবে সে। এমন গন্ধ পৃথবিীর আর কিছুতেই যেন পাওয়া যায় না। কি অদ্ভুত! গাঢ়ো! একবার মাথার ভেতর গেঁথে গেলে পৃথিবীর অন্য সব গন্ধকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে দেয়া যায়। অসিত তার বৌয়ের নামটির প্রেমেও মশগুল ছিল অনেকগুলো বছর। আয়ুশি রানী পাল। প্রথম যখন অসিতের বাবা ছেলের জন্য বিয়ে ঠিক করে এসে কনে সম্পর্কে দীর্ঘ বর্ণনা দিচ্ছিলেন, প্রথমেই সে জানতে চেয়েছিল আয়ুশি নামের অর্থ কি। বাবা বলতে পারেন নি। আয়ুশির বাবা-মাও জানতেন না। নিজের নামের অর্থ কখনও জানতে ইচ্ছে না করলেও স্ত্রীর নাম নিয়ে তার ভাল লাগার অন্ত ছিল না। দূর্গা নদীর ওপারে আয়ুশিদের গ্রাম। বিয়ের রাতেই বৌয়ের কাছে জানতে চেয়েছিল তার নামের অর্থ। সেও জানতো না। শুধু বলেছিল তার বাবা বলতে পারবে। আয়ুশির বাবা ছিলেন বাগানকর; ভাড়ায় মালির কাজ করে বেড়াতেন। একবার কয়েকগ্রাম দূরে কাজে গিয়ে বাড়ির মালিকের সাথে আলাপের সময় মালিক তার মেয়ের নাম রেখে দিয়েছিলেন। তবে অর্থ বলে দেন নি। আসিত শহরের কলেজে গিয়ে এক শিক্ষকের কাছ থেকে অর্থ জেনে এসেছিল। পূর্ণিমা বা দীর্ঘ জীবন। আয়ুশি শব্দের পূর্ণিমা অর্থটি তাকে বেশি আকর্ষণ করেছিল। তারপর অনেক বছর সে আয়ুশিকে আদর করার সময় পূর্ণিমা বলেই ডেকেছে। মাঝে-মাঝে নিমা বলেও ডেকেছে।

কেমন করে দেখতে দেখতে তাদের মাখামাখির বছরটি পার হয়ে গেল। বছর ঘুরতেই আয়ুশি এক ছেলে-সন্তানের জন্ম দিল। বৌয়ের আদরে ছেদ পড়লো। আয়ুশির আর অসিতের দিকে নজর দেয়ারই সময় নেই। সারাক্ষণ ছেলেকে নিয়েই ব্যাস্ত। এমনটিই হয় – এই ভেবে আসিত আরো বেশি কাজে মন দেয়। নতুন মুখের জন্য চাই নতুন উপার্জন। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিল সে। ভেবেছিল চুল কাটানোর ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে একটি মুদির দোকান দেবে। অর্থের সংকুলান না হওয়ায় সে চিন্তা বাদ দিতে হয়েছিল। ঠিক তখনই দেশে খাবার-দাবারের অভাব দেখা দিল। কোথা থেকে যেন তাদের গ্রামে রাত-বাহিনী এল। সবার খাবার কেড়ে নিয়ে যেতে শুরু করলো। সব ধানীদের মাঠের ধান রাতারাতি উধাও হয়ে যেতে লাগলো; কারো সোনালী ধানে আগুন লাগা শুরু হলো।

একদিন শোনা গেল আয়ুশির বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে বলাবলি করলো তিনি সংগ্রামে গেছেন। কিসের সংগ্রাম, কার জন্যে সংগ্রাম, অসিত তখনও কিছু বোঝে না। শ্বশুরকে খুঁজতে গিয়ে আসিতের সাথে রাত-বাহিনীর সাথে দেখা হলো। তারা তাকেও দলে টানতে চাইলো। এদিকে খাদ্যাভাবে তার ও আয়ুশির শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। বৌয়ের শরীরে ভাটা পড়েছে। ছোট্ট ছেলেটার জন্যেও তার বুকে দুধের স্রোত আসে না। অসিত স্ত্রীকে আদর করা ভুলে গেল। রাত-বাহিনীর ছেলেরা তাকে দলে ভেড়াতে এতই টানা-হেঁচড়া শুরু করলো যে তার বাবা জোর করে তাকে পরিবারসহ শহরে পালিয়ে যেতে বাধ্য করলেন। সে বৌ-পুত্র নিয়ে ঢাকায় চলে এলো। থাকার আর কোন স্থান না পেয়ে সে রাজধানীর এক বিহারীপট্টিতে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন থেকেই এই পট্টিতেই জীবন কেটেছে। পট্টির জীবন সহজ ছিল না। একে তো অসিত অমুসলমান, তারপর গরীব। তার গরীবানা নিয়ে কোন সমস্যা হয় নি, তবে অমুসলমানিত্ব নিয়ে বেগ পেতে হয়েছে। দেশের বিহারীপট্টিগুলোতে দেশহীন মানুষের বসবাস। কেউ তাকিয়েও দেখে না এদের। পেটের দ্বায় মেটাতে চঞ্চল এরা। কি করবে জানে না; বেশির ভাগ সময় যা খুশি তাই করে। এদের অনেকেই ক্ষুধা মেটাতে চুল কাটানোর পেশা বেছে নেয়।

দুঃখ, জ্বরা, শোক – এসব কিছুর মধ্যে থেকেই এক বাঙ্গালী মালিকের সেলুনে চাকরি নিয়ে জীবন চালিয়েছে অসিত। স্ত্রী-পুত্রের জন্য অন্ন জোগানোই ছিল তার লক্ষ্য। আর কোন দিকে তাকায় নি। কষ্টের মাঝেই তার ও আয়ুশির শরীরে গতি ফিরে এল। আবারও ভালবাসাবাসির, আবারও মাখামাখির সাধ জাগলো। কিন্তু ততদিনে দু’জনে একে-অপরের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। রাতে আয়ুশির গায়ে হাত দিতেই বোঝে তার শরীর ঘুমে ভারি হয়ে আছে। যেন প্রকান্ড এক গাছের গুঁড়ি। নাড়ানোই যাবে না। ছেলে তখন এক এনজিওর ফ্রী ইস্কুলে যায়, ঘুমায় তাদের সাথেই। শহরের স্বামী-স্ত্রীদের দেখেছে একসাথে বেড়াতে যায়, ফুচকা-চট্পটি খায়। তাদের জীবনে এমন বেড়ানো কখনোই হয় নি। পুজো-পার্বণেও আয়ুশিকে নিয়ে কোন মেলায় যেতে পারে নি অসিত। আয়ুশি অভিযোগ করেছে অনেক, ঝগড়া-ঝাটিও হয়েছে অনেক। তাকে বুঝিয়েছে, গরিবের আবার ধর্ম কি? মেলা কি? তাদের পুরো জীবনটাই সংগ্রামের, কষ্টের। কষ্ট মেনে নিতে বলেছে। আয়ুশির আর কোথাও ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না; তার বাবা সত্যি-সত্যি রাত-বাহিনীতে যোগ দিয়ে একসময় পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন। মা’ও চলে গেছেন অসুখে – তার পরপরই।

আজ তার দোকানে নাচতে-নাচতে আসা মেয়েটি তার মনে কেমন এক স্পৃ হা জাগিয়ে তুলেছে। নিজের পৌরুষবোধ নাড়া দিচ্ছে। কেশের সুবাসে আজ নেশাগ্রস্থ সে। কাঁচি চালাতে পারছে না; আকাঙ্ক্ষায় গলে যাবে বলে মনে হচ্ছে। কোথায় যেন জল বয়ে যাওয়ার কল্-কল্ শব্দ কানে আসে। মনে হয় এখনই দোকানের ঝাঁপি বন্ধ করে ছুটে বেরিয়ে যায়। মগজের ভেতর থেকে একটি গাছ লকলকিয়ে খুলি ফুঁড়ে বেরোয়। নিজের নিশ্বাস থেকেই কেমন যেন আদর-আদর গন্ধ টের পাচ্ছে। বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে। কার জন্য হচ্ছে এসব? আয়ুশির জন্য? নাকি এই মেয়েটির এসেছে বলে। মেয়েটি কি তার ভেতরে আয়ুশির জন্য আদর উস্কে দিল? মেয়েটি কোথায় যেন বেড়াতে যাচ্ছে বলছিল। বলছিল, মামা তাড়াতাড়ি কাটেন; এক যায়গায় যেতে হবে। কোথায় যাবে সে? নিশ্চয়ই তার প্রেমিকের কাছে! থাকবেই তো; এ জমানায় সবারই তো প্রেমিক-প্রেমিকা আছে। এরা অসিতদের মত নয়। এরা সবসময়ই প্রেমী খুঁজে পায়।

অসিত ঠিক করে সে এখুনি বাড়ি যাবে। আয়ুশিকে নিয়ে বেড়াতে যাবে। কোথাও। যেখানে গেলে আয়ুশিকে আদরে ভরিয়ে দিতে পারবে।

মেয়েটিকে বলে, ‘দিদি; আপনার চুল কাটা হয়ে গেছে, আপনি এখন যান। টাকা দিতে হবে না; আমি আপনার চুলে কিছু করি নি; একটুও কাটি নি।‘

[শেষ]

প্রথম প্রকাশঃ ঈদসংখ্যা ইত্তেফাক, জুন ২০১৮।

One Reply to “প্রৌঢ়তা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *