Photo: ChatGPT

বাংলাদেশ বই পড়ুক

একটা আন্তর্জাতিক ব্যবসা সাময়িকী এক জরিপে দাবি করেছে যে, বাংলাদেশিরা প্রতিদিন ১০ মিনিট বই পড়েন, যার অর্থ হচ্ছে বছরে ৬২ ঘণ্টা। অবাক হচ্ছেন? আমার ধারণা ছিল আরও কম সময় আমরা বই পড়ি। যদিও বাংলাদেশ ১০২টি দেশের মধ্যে ৯৭তম স্থানে রয়েছে, এটি জেনে ভালো লাগছে যে, আমরা এখনো পড়ছি। তার কারণ আমরা বেঁচে আছি এমন একটা যুগে যখন আমাদের মন অহেতুক ভাইরাল বিষয়গুলোতে স্থানান্তরিত হয়ে বই ও অন্যান্য কাজের প্রতি মনোযোগ ধ্বংস করছে।
আপনারা নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন এই ১০২টি দেশের মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি দেশের পাঠক কারা। দেশগুলো হচ্ছে—আমেরিকা, ভারত (দ্বিতীয় স্থানে), ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালি।
হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন—ভারত। এই পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ভারত? ভারতীয়রা আমাদের চেয়ে বেশি বই পড়েন? অবশ্যই পড়েন। তা ভারতের যে কোনো শহরে গেলেই বোঝা যায়। ভারতের কর্তৃপক্ষ নীতিনির্ধারণীর মাধ্যমে সেখানকার মানুষকে পড়তে উৎসাহিত করে বলেই মনে হয়। বই পড়ার সংস্কৃতি সেখানে এখনো বেঁচে আছে। এখন পর্যন্ত অনেক ভারতীয় নাগরিক লিখতে-পড়তে পারেন না, কিন্তু দেশটা এক বহুভাষিক দেশ এবং সেখানে হাজার হাজার প্রকাশনা সংস্থা এবং সংবাদপত্র রয়েছে, যারা একনিষ্ঠভাবে পাঠযোগ্য পড়ার বিষয় তৈরি করে চলেছে, যা সত্যিই পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। পশ্চিমা অনেক বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাও এখন ভারতে এসে রমরমা ব্যবসা করছে। ভারতের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর প্রকাশনা শিল্পের কিছু কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে, যা মানুষের মধ্যে পড়ার অভ্যাস প্রচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তা হচ্ছে, ভারতের গণমাধ্যম বই নিয়ে অনবরত কথা বলে।
এই প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমাদের দেশে বই নিয়ে কথা বলা শুধু ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনা। আমাদের প্রকাশকরা নতুন লেখক খোঁজার চেষ্টা খুব একটা করেন বলে মনে হয় না এবং শুধু জনপ্রিয় লেখকদেরই আরও জনপ্রিয় করার কাজে ব্যস্ত থাকেন। আমাদের সংবাদপত্রগুলো তাদের সাপ্তাহিক সাহিত্য পাতায় বইয়ের জন্য সামান্য স্থান বরাদ্দ করে। অনেকে করেই না। আমরা ভুলেই যাই যে, বই এবং বই পড়ার অভ্যাসকে প্রচারের বড় দায়িত্বটা মিডিয়ারই।
আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশে বই এবং পড়ার অভ্যাস নিয়ে চারদিকে তাকালে একটি হতাশাজড়ানো চিত্র চোখে ভাসে। যদি আমরা সত্যিই মানুষকে পড়াতে এবং বাংলাদেশে একটি সুস্থ বই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই, তাহলে একটা উপায় রয়েছে—দেশব্যাপী অনেক পাঠচক্র তৈরি করা।
হ্যাঁ, দিব্যি দিয়ে বলছি। এখন একমাত্র পাঠচক্রগুলোই পারে আমাদের দেশে বই পড়ার সংস্কৃতিকে আবার ফিরিয়ে আনতে, আমাদের পাঠাভ্যাসে পরিবর্তনে সাহায্য করতে। এ বিষয়ে একটা ছোট্ট গল্প বলতে চাই যে, আমরা কীভাবে আমাদের কর্মস্থলে এমন একটা পাঠচক্র তৈরি করে অসাধারণ ফল পেয়েছি।
প্রতিষ্ঠানটি ব্র্যাক ব্যাংক। যখন আমরা ব্র্যাক ব্যাংক রিডিং ক্যাফের যাত্রা শুরু করি, তখন আমরা সংখ্যায় ছিলাম মাত্র ১০ জন। আমরা প্রতি মাসে একটা বই বেছে নিয়ে পড়া শুরু করি এবং আলোচনায় বসতে শুরু করি। কখনো কখনো, বইয়ের লেখকদেরও আমন্ত্রণ জানাই। এক বছরে, আমাদের পাঠচক্র সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার সহকর্মীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এবং আমাদের পুরো প্রতিষ্ঠানে ধীরে ধীরে একটা পড়ার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। বিষয়টা এখন শুধু আমাদের কর্মস্থলে নয়, সহকর্মীরা তাদের পরিবার এবং গ্রাহকদের মধ্যেও এ বই পড়ার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এখন আমাদের কর্মস্থলে তিনটা পাঠচক্র তৈরি হয়েছে। আমাদের সহকর্মীরা এখন সম্মানিত গ্রাহকদের বই উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
কল্পনা করুন বাংলাদেশের ৬১টা ব্যাংকে এমন ৬১টা পাঠচক্র গড়ে উঠেছে। আরও কল্পনা করুন যে দেশের প্রতিটি সংবাদপত্রের অফিসে একটা করে পাঠচক্র আছে, প্রতিটি প্রকাশনা সংস্থা একটা করে পাঠচক্রের আয়োজন করে এবং কল্পনা করুন ৬৪টা জেলা কমিশনার ৬৪টা পাঠচক্র তৈরি করে তাদের সহকর্মী এবং এলাকার মানুষদের নিয়ে বই পড়ছেন এবং তা নিয়ে আলোচনা করছেন; এমন হলে বাংলাদেশ বদলে যাবে।
জাতির মনন গঠনে বই পড়ার প্রভাব যে কতটা গভীর হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের এখনো হয়নি। হয়তো আমরা ভাবতেও পারি না। যদি এক হাজার পাঠচক্রের সদস্যরা প্রতি মাসে একটা করে বই পড়ে, তাহলে তা বছরে ১২ হাজারটা বই পড়ার সমান হয়। যদি এক হাজার পাঠচক্রে ২০ জন পাঠক থাকেন, তাহলে তা ২০ হাজার জন একনিষ্ঠ পাঠকের সমান।
এবার কল্পনা করুন যে, ২০ হাজার পাঠক তাদের পারিবারিক, ব্যবসায়িক এবং জাতীয় পরিসরে কেমন প্রভাব ফেলতে পারেন। এ প্রভাবকে স্বাগত জানাতেই বাংলাদেশের সবাই বই পড়ুক—বাংলাদেশ বই পড়ুক।
First published in daily Kalbela…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *