বাইরে বাদামি, ভেতরে-ভেতরে সাদা

মাঝে-মাঝেই নিজেকে নারকেলের মতো মনে হয়। নারকেলের ওপরটা বাদামি এবং ভেতরের শাঁস সাদা। আমি, ইকরাম বাঙালির গায়ের রং বাদামি, কিন্তু আমার ভেতরটা সাদা হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় থাকে। আমাদের দেশে সব মানুষের গায়ের রং কালো, বাদামি, উজ্জ্বল কালো (আমরা যাকে আদর করে শ্যামলা বলি) এবং উজ্জ্বল বাদামি (আমরা যাকে ফর্সা বলি)। এখানে গায়ের রং ফর্সা করার একটি ক্রিম কিনতে পাওয়া যায় এবং তা অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশে বোধহয় আরও বেশি জনপ্রিয়। বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে এই ক্রিমটি কেনার উদ্যোগ দেখে মনে হয় আমরা আমাদের গায়ের রং নিয়ে খুশি নই। আমাদের গায়ের, বিশেষ করে চেহারার বাদামি ও কালো রং সাদা করতে হবে।
এমন ক্রিম বাজারে আসার আগে আমাদের অনেক রকমের ক্রিম ছিল যা মেখে আমরা আমাদের গায়ের রং বদলাতে চেয়েছি। আমরা ট্যালকম পাউডারের আস্তরণ দিয়ে চেহারা সাদা করতে চেয়েছি। কোম্পানিগুলো বোঝে বাঙালি কি চায় এবং তারা তেমন ভাবেই তাদের পণ্য তৈরি করে। করবেই তো। যে পণ্যের চাহিদা আছে, তা ব্যবসায়ীরা তৈরি করে বিক্রি করবে। সহজ অঙ্ক।
এ ধারণা আমাদের মনে এলো কোথা থেকে? সাদা ত্বক নিয়ে আমাদের জন্ম হয়নি, তবে আমরা চাই আমাদের ত্বক সাদা হোক। এই মানসিকতা এটাই প্রমাণ করে যে, গায়ের রং নিয়ে এক ধরনের হীনন্মন্যতা আমাদের মনে কাজ করে। একই সঙ্গে সাদা ত্বকের প্রতি আমাদের এক গভীর মোহ তৈরি হয়েছে। আমরা এই মানসিকতা নিয়েই বেড়ে উঠেছি। আমাদের সমাজে যখনই কোনো শিশুর জন্ম হয়, প্রথমেই আমরা তার গায়ের রং নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। জানতে চাই, ‘বাচ্চার রং কি ফর্সা হয়েছে? সুন্দর হয়েছে?’ আমাদের আত্মীয়স্বজন প্রথমে তাই জানতে চাইবেন। তারপর তারা হয়তো দেখতে চাইবেন শিশুটি কার মতো দেখতে হয়েছে- বাবা না মা?
বাংলাদেশে একজন মেয়ে বা মহিলার গায়ের রং যদি কালো হয়, তাহলে তার অবস্থা কি হয় তা আমাদের জানা আছে। বিয়ের বাজারে তার চাহিদা সবচেয়ে কম। তাকে কোনো পুরুষ বিয়েই করতে চান না। বাংলাদেশের পুরুষরা বিয়ে করার সময় সাদা ত্বকের নারী চান। এটি আমার মতো আরও কোটি পুরুষের মস্তিস্কে গেঁথে আছে। সাদা অর্থই সুন্দর। কতভাগ পুরুষ সাদা রঙের মেয়ে বিয়ে করতে চান তা আমি বলতে পারব না, তবে আমি দেখেছি আমার আশপাশের পুরুষরা সবাই তাই চান। বউ ফর্সা হতে হবে।
আমরা কি এখনও আমাদের মানসিকতার জন্য লজ্জা বোধ করব না? আমরা হয়তো অনেকেই দেখে থাকব যে গেল প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেক তরুণী এবং মহিলাদের দেখা যাচ্ছে চুলে নানা ধরনের রং করতে। অনেক রঙের চুল সোনালি, বাদামি, বারগান্ডি ইত্যাদি। পুরুষদেরও দেখা যায় চুলে এমন সব রং দিতে। অনেকে বলেন, তারা অনেকদিন ধরে চলে আসা প্রথা ভাঙতে চান। সামাজিক প্রথার শেকল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চান। তবে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় যে তারা আসলে তাদের কেশের কালোত্ব চান না। অন্য রং চান। এই মানসিকতা সাদা মানুষের প্রতি ভক্তি থেকে। তারা মনে করেন, সাদাদের মতো চুলের রং আমাদেরও বেশ মানাবে।
আমি একজন বাঙালি নারীকে চিনি যার গায়ের রং ইউরোপিয়ানদের মতো সাদা, চোখ নীল এবং চুল সোনালি। এ দেশের পুরুষদের জ্বালাতনে এই নারীর সারাজীবন ঝালাপালা হয়েছে। এ দেশে আমার দেখা প্রায় সব পুরুষের কাছেই তিনি যৌনাবেদনময়ী ছিলেন। বলার চেষ্টা করছি যে কোনো শ্বেতাঙ্গ-গরিষ্ঠ দেশে যখন কোনো বর্ণবাদী ঘটনা ঘটে, আমরা বাঙালিরা ছি ছি করি, সমালোচনা করি, গালি দেই, কিন্তু আমাদের নিজেদের মাঝে যে এক বর্ণবাদী সত্তা বিদ্যমান তা অবলীলায় ভুলে যাই। আমরা তখন এই নারকেলের মতো সত্তা নিয়ে সাদাদের ধিক্কার দেই। ভুলে যাই আমাদের নিজেদের আত্মার ভেতরে সাদার প্রতি টান আছে।
আমরা আফ্রিকার মানুষদের কি চোখে দেখি? আমাদের গায়ের রং কালো ও বাদামি, কিন্তু আমরা ওদের ‘কালা’ বা ‘কাইল্লা’ বলে ডাকি। কারণ আমাদের বাইরেরটা কালো বা বাদামি, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে সাদা মনে-মনে আমরা শ্বেতাঙ্গ। এমন অবস্থায় আমরা কেমন করে এলাম? সাদাদের প্রতি আমাদের মোহগ্রস্ততা ঠিক কবে থেকে শুরু হলো? আমরা আফ্রিকানদের নীচু চোখে দেখা কবে থেকে শুরু করলাম? যদিও এ নিয়ে কোনো গবেষণা চোখে পড়েনি; তবে কিছু ধারণা আমার এ ব্যাপারে মনে জন্মেছে।
আমরা অনেক বছর ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা শাসিত হয়েছি। ইংরেজরা ১৯০ বছর ধরে আমাদের মনের ভেতর সাদা-মোহতা গেঁথে দিয়ে গেছে। তার আগে থেকেই পর্তুগিজরা আমাদের দেশে লুটপাট চালিয়েছে। তারাও সাদা। আমি জানি না মোগলদের আমরা সাদা মনে করি কিনা, তবে এটুকু বুঝি যে তারা আমাদের মতো নয়।
তারা সবাইই আমাদের অনগ্রসর ও অসভ্য মনে করে আমাদের সঙ্গে তেমনই আচরণ করেছে। তাদের মতো করে সভ্য করে তুলতে গিয়ে আমাদের মনের ভেতর ‘সাদাত্ব’ ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই দাসত্ব আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে ওরা আমাদের চেয়ে উন্নত এবং সবদিক দিয়েই সভ্য। তারাও চেয়েছে আমরা এটাই বিশ্বাস করি। সাদাত্ব এখনও আমাদের সমাজ শাসন করছে। আমরা এখন না বুঝেই তাদের রঙের দাসত্ব করছি। একটা বড় সময় ধরে আমাদের প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছিল। সে থেকেই আমরা নিজেরাও শিখে গেছি কেমন করে নিজেদেরই প্রান্তিকীকরণ করে রাখতে হয়। আমরা ঠিক জানি না আমাদের মনের এই কালোত্ব থেকে কবে বের হতে পারব, আমাদের নিজেদের বর্ণবাদী আত্মা কবে মুক্তি পাবে।
প্রথম প্রকাশঃ সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *