ভবিষ্যতের ব্যবসা

আমার ছোট ছেলের ক্লাসে পরিবেশ বিদ্যা পড়ায়। তবে সে বিষয়টি খুব একটা পছন্দ করে না। সে বলে, তার বইয়ে শুধু পরিবেশ নিয়ে অ-আ-ক-খ শেখাচ্ছে, পরিবেশ সংক্রান্ত সত্যিকারের সমস্যা সমাধানের কোন বিষয় শেখাচ্ছে না। সে বলে সে আর এই বিষয়টি তার ক্লাসের পড়া হিসেবে পড়তে চায় না; সে নিজেই অনেক বিষয় জানে যা তার ক্লাসে পড়ায় না।

আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। উপদেশ দেই আরো ভাল করে এই বিষয়টি পড়তে, কারণ বিশ্বের পরিবেশের যা অবস্থা এবং ভবিষ্যতে আমাদের পরিবেশ যা হতে যাচ্ছে, তখন পরিবেশ বাঁচানোই সারা বিশ্বে একটি বড় ব্যবসা হবে। অন্য কোন ব্যবসাই পরিবেশের কথা চিন্তা না করে দাঁড়াতে পারবে না।

আমরা কিছু ব্যবসা-বানিজ্যের আলাপে চলে যাই। ব্যাখ্যা করি আমরা কেন এবং কবে থেকে বোতল-জাত পানি পান করা শুরু করলাম; পানি কিনে পান করা শুরু করলাম। সে বেশ মজা পায়। আমি বলি, আমরা যদি বোতলের পানি কিনে পান করতে পারি, আমরা বোতল-জাত বাতাসও কিনতে পারি। বিশ্বে কিছু কিছু কোম্পানি ইতিমধ্যেই বোতল-জাত অক্সিজেন বিক্রি করা শুরু করেছে। অনেক শহরের বাতাস নিশ্বাস নেয়ার অনুপযোগী হয়ে যাওয়াতে সেখানে বোতলে করে অক্সিজেন বিক্রি শুরু হয়েছে। ছেলে আমার শুনতে আরো আগ্রহ দেখায়। সে ব্যবসা-বানিজ্য নিয়ে পড়া-লেখা করে। আমি তাকে বলি, অক্সিজেন কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতে আমাদের বাড়িতে যন্ত্র লাগিয়ে দিয়ে যাবে যেখান থেকে শুদ্ধ অক্সিজেন নির্গত হবে। আমাদের বাইরের বাতাস এতই দুষিত হবে যে আমাদের আপিস-আদালত-বাড়িতে এ ধরণের যন্ত্র প্রয়োজন হবে বেঁচে থাকার জন্যে।

ছেলের আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে।

অনেকদিন ধরেই আমি তাকে ইন্টারনেট, ইন্টারনেট অব থিংস এবং রোবটের কথা বলচ্ছিলাম। সে নিজেও অনেক ভেবেছে এগুলো নিয়ে।

সে বলে, “বাবা, তুমি কি জানো বাংলাদেশে রোবট এসে গেছে? একটি রেস্তোরাঁ রোবট নিয়ে এসে ওয়েটারের কাজ করাচ্ছে? একটি টেলিকম কোম্পানিও তাদের সেবাকেন্দ্রে কাজ করার জন্য রোবট এনেছে?” আমি বলি যে আমি জানি এবং এও তাকে বলি যে এমন রোবট এসে বাংলাদেশ ভরে যাবে।

আমি ওকে জানাই খুব শিঘ্রই সার্ভিস রোবট ও সেন্সর এসে সারা বিশ্বে মৌমাছির মত ভরে যাবে। আমরা রোবট ও সেন্সর মধ্যেই বসবাস করবো। তখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে হাজার হাজার রোবট ও সেন্সর প্রস্তুতকারক আসবে এবং রোবট ও সেন্সর নষ্ট হলে সেগুলো ঠিক করার জন্য মেকানিক তৈরী হবে। আমরা আগে দেখেছি নষ্ট কাসেট-রেকর্ডার এবং মোবাইল ফোন ঠিক করার জন্য হাজার হাজার মেকানিকের জন্ম হয়েছিল। প্রথম প্রথম বাংলাদেশ রোবট ও সেন্সর আমদানি করবে; তারপর এক সময় রোবট ও সেন্সর প্রস্তুতকারীরা এখানেই তাদের কারখানা বানাবে।

আমি ওকে বলি, “তুমি জানো, আমি ও তোমার মা চাইলেই তোমার স্কুলের ব্যাগে একটি চিপ্ দিয়ে দিতে পারি যা তোমার গতিবিধি আমাদের জানাবে?” সে মন খারাপ করে। সে চায় না আমরা তার সাথে একটি চিপ্ লাগিয়ে দেই।

ভবিষ্যতে চিপের একটি প্রকান্ড বাজার তৈরী হবে। আমাদের বাড়ি, আমাদের গাড়ি, আমাদের কর্মস্থল। আমাদের শহর – সবস্থানে এবং সব জিনিসে গায়ে অযুত-লক্ষ-কোটি সেন্সর লাগানো থাকবে। আমার সন্তান খুব মজা পায়। আমি তাকে বলি শুধু আমাদের চলাফেরা নয়, এই চিপ্ গুলো দিয়ে আমাদের স্বাস্থের পরিস্থিতিও বোঝা যাবে।

একথা বলে আমি তাকে মনে করিয়ে দেই, এমন একটি জটিল সাইবার পরিবেশে আমাদের গোপনীয়তা  রক্ষা করা একটি প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা স্মার্ট বাড়ি, স্মার্ট কারখানা, স্মার্ট হাসপাতাল, স্মার্ট শহর তৈরী করা শুরু করবো, তখন আমাদের নিজ-নিজ একাউন্টের মাধ্যমে সবগুলো চালাতে হবে এবং সেই একাউন্টের সাথে হাজার হাজার সেন্সরের যোগাযোগ থাকবে। সে কারণেই আমাদের একাউন্টের গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন হবে। আমাদের সব তথ্য সুরক্ষা করার প্রয়োজন হবে যেন পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙ্গে না পড়ে। আমি ওকে জানাই কিভাবে এই গোপনীয়তা সুরক্ষা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে অনেক মুনাফা করবে। এই ব্যবসা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু ভবিষ্যতে আরো বড় আকারে হবে।

আমার ছেলে আরো আগ্রহ পায়। সে আগ বাড়িয়ে বলে সে ইতিমধ্যেই জেনে গেছে আগামীতে গনমাধ্যম – বিশেষ করে বিনোদনমুলক মাধ্যম – ভবিষ্যতে অনেক বড় ব্যবসা হবে। সে জানতে চায়, “বাবা, বিনোদন ব্যবসা তখন কেমন হবে?” আমি বলি, “তুমি এখ যেমন সিনেমা অথবা গান দেখছো ইউটিউব, আইফ্লিক্স বা নেটফ্লিক্সে, ভবিষ্যতে দেখবে হলোগ্রামে। ভবিষ্যতে হলোগ্রাম থিয়েটার একটি বড় ব্যবসা হবে; সব সিনেমার তাকরারা  ঠিক তোমার সামনে দাঁড়িয়েই তাদের অভিনয় দেখাবেন।“ সে হাসে।

আমি আবার তার বিষয়ে ফিরে আসি। পরিবেশবিদ্যা। প্রশ্ন করি, “তুমি জান সমুদ্রের তলদেশ পরিস্কার করা একটি ভিশন বড় ব্যবসা হয়ে উঠবে?” আমি চেষ্টা করি পরিবেশ বিষয়ে তার আগ্রহ বাড়াতে। সে চন্তা করে এবং আমায় বলতে বলে। আমি তাকে জানাই, আমরা সাগরের পানি এতটাই কলুশিত করে ফেলবো এবং সাগরে আমাদের সব বর্জ ফেলে তা ময়লা করে ফেলবো তা পরিস্কার করার জন্য আলাদা প্রকল্প হাতে নেবে অনেক কোম্পানি। তারা প্রচুর মুনাফা করবে।

তাকে আমি আরো বলি যে ভবিষ্যতে পানি হবে অত্যন্ত একটি মুল্যবান বস্তু। এখন তেল যেমন অর্থকরী পণ্য, পানি হবে তেমন। দেশে-দেশে, অঞ্চলে-অঞ্চলে পানি নিয়ে যুদ্ধ হবে। আমি আমাদের দক্ষিওন এশিয়ায় পানি ভাগাভাগি নিয়ে টানাপোড়েনের বিস্তারিত জানাই। সে অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, “বাবা, আমরা সবাই তো অনেক পানি নষ্ট করি!” আমি আরো জানাই কেমন করে দক্ষিন আফ্রিকার কেপটাউন শহর এ বছরের জুন মাস থেকে পানিহীন হয়ে যাবে।

আমার ছেলে গাড়ি খুব পছন্দ করে। গাড়িতে চড়ে বিভিন্ন্ স্থানে যাওয়া-আসা করার সময় তার চোখ থাকে রাস্তার অন্যান্য গাড়িগুলোর দিকে। বাংলাদেশের রাস্তায় কোন কোন ব্র্যান্ডের গাড়ি চলে, সেগুলোর মুল্য কত, লিটারে কত কিলোমিটার চলতে পারে ইত্যাদি। আমি তার কাছে জানতে চাই, “তুমি কি জানো ঢাকায় বৈদ্যুতিক গাড়ি ইতিমধ্যেই চলে এসেছে?” সে বলে সে জানে। “ওগুলো যেহেতু বিদ্যুতে চলবে, ওদের চার্জ দেবে কোত্থেকে? ওদের চার্ক দেয়ার জন্য অনেক চার্জিং ষ্টেশন তৈরী হবে এবং তা হবে ভবিষ্যতের একটি বড় ব্যবসা।“ আমি তাকে আরো জানাই যে তখন আর সিএনজি ষ্টেশন এবং প্রেট্রল পাম্প আর থাকবে না। আমাদের সামনে দিন আসছে যখন বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে এবং আমাদের বিদ্যুৎ উৎপণ্য করতে ভিন্ন পন্থা নিতে হবে।

এই গতানুগতিক পন্থায় আর আমরা বিদ্যুৎ উৎপণ্য করতে পারবো না। আমাদের তেল, গ্যাস ও কয়লা ফুরিয়ে যাবে। বাধ্য হয়েই আমরা উইন্ড (বাতাস) ও সূর্যের ওপর নির্ভর করবো। বাতাস থেকে এবং সুর্য থেকে বিদ্যুত আরোহন আমরা অনেক দিন ধরেই অবহেলা করে এসেছি, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে তা আর সম্ভব হবে না।

“বাবা, আমাদের রান্নাঘরের কি হবে তখন? আমরা রান্না করবো কি দিয়ে?” সে জানতে চায়। আমি তাকে বলি, “বাবা, ভবিষ্যতে আমাদের রান্নাঘর নাও থাকতে পারে; সবাই এতো ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে রান্না করার সময় নাও পেতে পারে; আময়াদের খাবার কিনে খেতে হতে পারে। ভবিষ্যতে খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা আরো বড় হবে।“ আমি তাকে প্রশ্ন করি, “তুমি কি জানো আমাদের খাদ্যদ্রব্যও ফুরিয়ে যাবে? আমরা মাছ-মাংস খেয়ে শেষ করে ফেলবো। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে পরীক্ষাগারে মাংস উৎপাদন শুরু হয়েছে।“

সে এই বিষয়টি জানে না। ভবিষ্যতের কথা ভাবতেই তার মন দমে যায়। সে মার দিকে দৃষ্টিহীন চোখে তাকায়। আমায় প্রশ্ন করে, “তোমার কি মনে হয় আমি পরিবেশবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করলে কি তখনকার সমস্যাগুলোর সমাধান কিছুটা হলেও করতে পারবো?”

আমি পরিস্কার দেখতে পাই আমাদের এ আলোচনার পর পরিবেশ নিয়ে তার ভেতর খুব আগ্রহ তৈরী হয়েছে; আমি খুশি হই। বলি, “হ্যা বাবা, পারবে।“ সেদিনকার মত আমাদের আলোচনা শেষ হয়, তবে আমি ভবিষ্যতের ব্যাবসা নিয়ে তার সাথে আরো আলাপ করার প্রতিশ্রুতি দেই।

4 Replies to “ভবিষ্যতের ব্যবসা”

  1. Vai, khubi valo laglo. Ato sohoj bashay ai kothagulo Kew bole na. Arir freshner ER kothao bolte parten. Batash bikrir somoy. Overall khubi valo lekha … Thank you so much

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *