মনজুর সাহেব সুবহে-সাদেকের পর জায়নামাজ থেকে উঠে জানালার পাশে তসবিহ হাতে বসে জিকির করতে করতে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আধো-আধো আলোয় দেখলেন অনেকগুলো মশা কাঁচের গায়ে মাথা গুঁজে আছে। নড়াচড়াও বোঝা যাচ্ছে। যেন ভেতরে আসতে চাইছে। তিনি দিব্যি দেখতে পাচ্ছেন। এই পতঙ্গগুলো এমনই, ভাবলেন তিনি। রক্ত চুষতে আসছে। রক্ত চোষাই এদের একমাত্র কাজ। মানুষ ও জীবের গায়ে বসে রক্ত চোষাই এদের জীবনের লক্ষ্য। কতক্ষণেরই বা জীবন! রক্ত খাওয়ার পর এক চাপটা মারলে কোথায় চলে যাবে! জিকিরে মন দেন তিনি। ফজরের আজান পড়লে আবার নামাজে বসেন। তখনও তার স্ত্রী জয়নাব বেগম মশারীর ভেতরে ঘুমুচ্ছেন। জয়নাব নামাজ-কালাম পড়েন না। তাদের বিয়ের পর কখনওই পড়েন নি। অনেক চেষ্টা করেও মনজুর সাহেব তাকে আল্লাহ-খোদার দিকে আনতে পারেন নি। নামাজ না পড়ার জন্য তিনি যখন তাকে তিরস্কার করেন, জয়নাব বলেন, শুধু পড়ে-পড়ে ঢিব দিলেই খোদাকে পাওয়া যায় না, আশেপাশের মানুষের কি করে ভাল হবে, ভাল থাকবে তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়। এই নামাজ পড়া নিয়েই যত ঝামেলা তাদের মধ্যে। কাল রাত তাদের একেবারেই ভাল যায় নি। প্রায়ই এমন হয় – ভাল যায় না। জয়নাবকে নামাজের জন্য জোর করতেই তিনি অশ্রাব্য সব গালি দিতে শুরু করলেন। গালিগালাজ এমন এক পর্যায়ে গেল যে মনজুর সাহেব তার স্ত্রীর মুখে কয়েকটি ঘুঁসি বসিয়ে দিলেন। রক্তাক্ত হলেন জয়নাব। তিনি তার ভাগ্যকে অভিসম্পাৎ করে অনেক্ষণ দেয়াকে কপাল ঠুকলেন। তাতে আরো রক্তপাত হলো। একসময় ক্লান্ত হয়ে তিনি ঘুমিয়ে গেলেন। তবে সারা রাত ঘুম হলো না মনজুর সাহেবের। ফজরের নামাজ পার করে কোরান নিয়ে বসলেন। সুর করে পড়তে-পড়তে দেখেন আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। জয়নাবের সাথে রাতের ঘটনা তাকে পীড়া দিচ্ছে। একবার ভাবেন স্ত্রীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে ক্ষমা চাইবেন। এমন ক্ষমা তিনি অনেকবার চেয়েছেন। তার ইচ্ছে হয় জানালা খুলে দিয়ে শুদ্ধ বাতাস বুকে ভরে নিতে। তাইই করেন তিনি। কাঁচের গায়ে বসে থাকা মশাগুলোর কথা আর ভাবেন না। মনে নেই তাদের কথা। কিন্তু জানালা খুলতেই কোথা থেকে যেন লক্ষ-লক্ষ মশা একসাথে রেলগাড়ির মত ঘরে ঢুঁকে পড়তে থাকে। হাতে ধরা আসমানী কিতাব কোথায় রাখবেন তিনি ভেবে পান না।। জয়নাবের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথাও ভুলে যান।

* * * * * * * * * * * *

গোয়ালন্দ ঘাটের অদূরেই আনন্দ ভবন। রাত ভোর হওয়ার আগেই বাড়ির কর্তৃ ময়না বেগম ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানায় গড়াচ্ছেন। একটু পরই মেয়েদের দেখতে যাবেন। উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীরটা আজ ভাল নেই। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে মেয়েদের পাহারা দিতে-দিতে শরীরের বারোটা বেজেছে। জোর করেই উঠে পড়েন। সব খদ্দের বেরিয়ে গেলে মেয়েদের দেখাশোনা সেরে আবার ঘুমুনোর পরিকল্পনা আছে তার। প্রায় টলতে-টলতে নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দো’তলায় নামেন ময়না বেগম। সেখানে লম্বা একটি করিডোর। তার দু’পাশে ছ’টি ঘর। ছোট ছোট। শেষ সিঁড়িটা থেকে নেমে দাঁড়িয়েই করিডোরের দিকে তাকান তিনি। তাকাতেই, তিনটি ঘরের দরজা শব্দ করে খুলে যায়। প্রায় একই সাথে। বাকী তিনটি ঘরের খদ্দের ভোর হওয়ার আগেই চলে গেছে। বাকী তিনজনকে আর্ত্মচিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসতে দেখেন তিনি। পরিস্কার দেখতে পান তাদের মুখ দিয়ে কালো শাপের মত হাজার-হাজার মশা লাইন ধরে ফিতের মত বেরিয়ে আসছে। মর্দগুলো বাতাসে মশা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতো মশা যে পাঁচ সেকেন্ডেই করিডোর আঁধার হয়ে গেল। মশা উগরাতে-উগরাতে তারা তার পাশ দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে সাঁই-সাঁই করে একতলায় নেমে যান। তড়িঘড়ি করে নেমে যাওয়ার সময় ময়নার গায়ের সাথে তাদের গা ছুঁয়ে যায়। তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই টের পান তার নাকের দুই ছিদ্র দিয়ে অনর্গল জলপ্রপাতের মত মশা বেরুচ্ছে। শত শত। পাগলের মত মাথা নাচতে শুরু করেন তিনি – এদিক থেকে ওদিক, ওপর থেকে নীচে। মশাগুলো থামে না, বেরুতেই থাকে। নাক দিয়ে। ছ’টি ঘরের দরজা দিয়ে মেয়েরা উঁকি দিয়ে দেখতে থাকে কি হচ্ছে। মেয়েদের চেহারা ও মনে উত্তেজনা নেই। তারা শুধু তাকিয়েই থাকে। তাদের চারপাশে মশা নেই।

* * * * * * * * * * * *

মুক্তিযুদ্ধ-ফেরত সমাজকল্যান মন্ত্রনালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এক সময়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-সচিব অনীল কুমার শ্যানাল এতো বছর বাঁচবেন তার ছেলে-মেয়েরা ভাবেই নি। দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। স্ত্রী গত হয়েছেন অনেক বছর হলো। তার বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মী – তারাও চলে গেছেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি পঁচাশি বছর ধরে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছেন। সারা জীবন চাকরী করে যে অর্থ ব্যাংকে জমা করে রেখেছেন তা নিজের জন্য ব্যয় করে যাচ্ছেন। এক সময় স্ত্রী চম্পা তার জমানো টাকার নমিনী ছিলেন, শ্যানাল বাবু চম্পার নাম বদলে তাদের চার ছেলে-মেয়ের নাম লিখে দিয়েছেন। সাধারনত সবাই বড় ছেলের নাম নমিনীর ঘরে লেখেন। তার ইচ্ছে হয় নি। তিনি তার অর্থ তার চার সন্তানকেই দিয়ে যেতে চান। তবে চারজনের নাম একসাথে লেখায় তারা খুশী হয় নি। একেক জন চেয়েছে তাকেই যেন বাবা নমিনী করে রেখে যান। আজ সকালে শ্যানাল বাবুর অবসর ভাতা তুলতে ব্যাংকে যাওয়ার কথা। কিন্তু বুকের পাঁজরের ভেতরে এক অদ্ভূৎ ব্যাথায় বিছানা থেকে উঠতে পারলেন না। মোবাইল ফোনে ‘এক’ চাপলেই বড় ছেলের কাছে ফোন চলে যাবে। ওদের কেউ একজন গেলেই তার ভাতা তুলে আনতে পারবে। বড় ছেলে আপিসের মিটিং’এ, মেয়ে দু’জন গেছে তাদের ছেলে-মেয়েদের ইস্কুল থেকে বাড়িতে ফেরত আনতে, ছোট ছেলে তার ব্যবসার কাজে গেছে চট্টগ্রামে। কাউকে না পেয়ে বুকে ব্যাথা নিয়েই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। লাঠি ভর করে। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলেন না। পড়ে যেতে-যেতে দেখলেন তার ঘরের চারপাশের দেয়াল ভেদ করে সাত সমুদ্র সমান মশা দলে দলে তার দিকে ধেয়ে আসছে। তার দশদিক নিমেষেই আঁধার হয়ে গেল।

* * * * * * * * * * * *

কারওয়ান বাজারের ফুটপাতের ওপর নুরজাহানের রাতের আস্তানা। সাড়ে-দশটা বাজে প্রায়। বিকেলে এই এলাকার কন্সটেবল জহুর তাকে ইশারা দিয়েছিল। সে নুরজাহানকে আদর করতে চায়। সাত বছরের ছেলে আমীনকে আগেই জানানো আছে আজ তারা ট্রাকগুলো থেকে ফুলকপি চুরি করবে। জহুর-পুলিশও তাদের সাহায্য করবে। জহুর এবং আরো অনেকেই তাদের সাহায্যে প্রতিরাতেই এগিয়ে আসে। তাদের ছাড়া এই ব্যবসা নুরজাহান চালাতেই পারতো না। গায়ের ছালা সরিয়ে উঠে দাঁড়ায় নুরজাহান। ছেলেকে বলে, ‘টিরাক আইলে একা উডবার পারবি তো? আমি আয়া পড়ুম দশ মিনিটের মিদ্দ্যেই’। আমীনুর বলে, ‘পারুম, মা; চিন্তা কইরো না; কিন্তু তুমি তাড়াতাড়ি আইসো’। পা চালিয়ে নুরজাহান বাজারের শেষ প্রান্তে চলে যায়। দু’টি ছ’তলা ভবনের মাঝে দেড়-ফুটের মত খালি যায়গা আছে যেখানে একজন মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে ও চলতে পারে। দু’জন চলতে গেলেই গায়ে-গায়ে ঘষা লাগে। আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে; তবুও মানুষ আসে-যায়। রাতে এই দেড়-ফুট গলিটা শাপ হয়ে যায়; প্রতি রাতেই অন্য কাজে ব্যবহার হয়; কেউ হাঁটে না; দাঁড়িয়েই শাপের মত পাক খায়। নুরজাহান অন্ধকারে ঢুঁকতেই তার চেহারায় মোবাইলের আলো ফেলে জহুর। ‘আইসস্? দেরী করলি ক্যান? আয়, এদিক আয়।‘ নুরজাহান উত্তর দেয়ার আগেই তার বুকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় জহুর-পুলিশ। নুরজাহান কিছু মনে করে না; এমন অনেক দেখেছে সে। তবে স্তম্ভিত হয় যখন দেখে পুলিশের হাত তার বুকঅব্দি পৌঁছুতে পারে না। জহুরের হাত গলে যাচ্ছে; সীসার মত গলে যাচ্ছে; গলে মশা হয়ে যাচ্ছে। নিমেশেই জহুরের দু’হাত ও মাথা লাখ লাখ মশায় রূপ নিয়ে দেড়-ফুট ফাঁক দিয়ে উড়ে যেতে থাকে। তার সারা শরীর মশাময় হয়ে গলে পড়ে। এ দৃশ্য দেখে ভয় পাওয়া ভুলে যায় নুরজাহান। দৌড়ে বেরিয়ে যায় চাপা গলি থেকে। তার আমীনুর ফুলকপি-ভর্তি ট্রাক দেখে মায়ের জন্য অপেক্ষা না করে লাফিয়ে বেরিয়ে গেছে। উঠে গেছে ট্রাকের পেছন বেয়ে। পকেটে ছোট্ট ছুরি। বস্তাগুলো কেটে দু’চারটি কপি বের করে রাস্তার ওপর ফেলে দেবে। আমীন ফেলে দিলে অন্য ফুটপাথওয়ালীর ছেলেরা কুড়িয়ে সেগুলো এক স্থানে নিয়ে যাবে। অনেকগুলো কপি জমলে সকালে বাজারে গিয়ে বেচে খাবার কেনার পয়সা আনবে। আমীন বস্তা কেটে কপি বের করতে গিয়ে দেখে সেখানে কপি নেই; বস্তা ভর্তি শুধু মশা আর মশা…

* * * * * * * * * * * *

চট্টগ্রামের খুলশীতে রাত একটু গভীর হলে তে’তলা বাড়ির দো’তলার ফ্ল্যাটে সঙ্গম-উন্মত্ত নাভিদ সামাদ টেলিভিশনের সামনে থেকে উঠে বিছনায় শুতে এসে হাত দেন স্ত্রী রুমানার গায়ে। প্রায় ছ’মাস তারা ভালবাসাবাসি করেন না। এ নিয়ে রুমানা অভিযোগ অনেক দিনের। আজ তিনি কেন রুমানাকে ছুঁতে এলেন তা তিনি নিজেও জানেন না। নাহিদার সাথে পরিচয়ের পর থেকে রুমানার সাথে তার শরীরযোগ হয় না বললেই চলে। রুমানা এখনও তার স্বামীর নতুন বান্ধবীর খবর জানেন না। সারা গায়ের বস্ত্র সরিয়ে লম্বা চুমু দিয়ে মুখ গহ্ববরে ঢুঁকে যাওয়ার চেষ্টা করেন নাভিদ। পারেন না। ভাল লাগে না। অন্য দিকে মন দেন তিনি। এবার মনে হয় কাজ হয়। রুমানার স্তনের বোঁটা চুষতে-চুষতে তার শিশ্ন দাঁড়িয়ে যাওয়া টের পান তিনি। সেখান থেকে মুখ সরিয়ে রুমানার দুই উরুর মাঝে হাত বাড়ান। যোনিপথ চোখে পড়তেই সেখানে ঢুঁকে পড়তে চান। যা ঘটছে তা তাড়াতাড়ি শেষ করতে চান কামাপ্লুত নাভিদ। হাঁটুর ওপর ভর করে চোখ বন্ধ করে রুমানার ভেতর ঢুঁকে পড়েন তিনি। চলে আসা-যাওয়া। হঠাৎ খেয়াল হয় রুমানার গলা থেকে কোন আনন্দ-শব্দ বেরুচ্ছে না। চোখ মেলে দেখেন তার ধবল স্তনের ইষৎ-গোলাপী বোঁটা দু’টোকে কালচে লাগছে। চোখ আরো বড় করেন তিনি। দেখেন বোটার চারিপাশে প্রায় শ’খানেক মশা বসেছে। তাদের জমায়েত ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে। কম্বলের মত পুরো স্তন ছেয়ে ফেলছে মশাগুলো। ভয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসেন রুমানার দুই উরুর মাঝখান থেকে। হাঁটুর ওপরই দাঁড়িয়ে, নজর চলে যায় তার নিজের জাহাজের কামানের মত তাক করে থাকা অঙ্গের দিকে। দেখেন সেখান থেকে কলের পানির মত মশা বেরুছে। আর্তচিৎকারে দিগবিদিক কাঁপিয়ে দিতে থাকেন তিনি। তার চিৎকার মশাগুলোকে থামাতে পারে না।

[শেষ]

প্রথম প্রকাশঃ ঈদসংখ্যা সমকাল, জুন ২০১৮।

One Reply to “মশা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

Immaturity dragging us down

There’s an interesting story about us Bengalis. God will not require any security guards i…