Photo- Google

মানুষ বনাম মানুষ

যখন একজন নারী একজন পুরুষ তাকে যা করতে বলছেন তা করেন না, পুরুষের কাজ বা কথার প্রতিবাদ করেন, প্রায়ই এমন হয় যে, পুরুষটি তাকে মারধর করেন। পুরুষটি হতে পারেন নারীর স্বামী, তথাকথিত পারিবারিক কর্তা, হতে পারেন ছেলেবন্ধু। তবে তার স্ত্রী বা মেয়েবন্ধুর কথা বা কাজ পছন্দ না হলে তাকে শারীরিক নির্যাতন করেন বা করতে উদ্যত হন। খুব স্তম্ভিত হই যখন দেখি বা শুনি যে, একজন আত্মপর স্বামী স্ত্রীকে মেরেছেন, কারণ তার স্ত্রী তার কথামতো চলেননি। মারধর হয়ে গেল। ঠিক সেই দিনই রাত আঁধার হলে যে নারীকে তিনি কিছুক্ষণ আগে মারধর করেছেন, তার প্রতিই তিনি ভিন্নমাত্রায় আকৃষ্ট হন।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে স্ত্রী একটু আগেই মার খেয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই স্বামীকে অভিসম্পাত করছেন- সে যেন নরকে যায়। হ্যাঁ, তাই-ই সত্যি। যখন কোনো পুরুষ কোনো নারীকে মারধর করেন, নারী তখন অবশ্যই পুরুষকে আশীর্বাদ করেন না। অভিসম্পাতই করেন। কারণ খুব সহজ। মানুষে মানুষে মধুর সম্পর্কের পূর্বশর্তই হচ্ছে ভালোবাসা। মারধর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়। শিক্ষক যখন তার এক শিশু ছাত্র বা শিশু ছাত্রীকে মারধর করেন, শিশুটির ওই শিক্ষক সম্পর্কে কী ধারণা হয়? শিক্ষকের হাতে মার খেয়ে বাকি জীবনটা সেই শিক্ষককে কীভাবে সেই শিক্ষার্থী মনে রাখে? সেই শিক্ষককে সে সারাজীবন ঘৃণার চোখে দেখে। মারধর কোনো শাস্তির উদাহরণ হতে পারে না। আমাদের সময়ও শাস্তি দেওয়ার সময় মারধর করা হতো। তাদের নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে আমরা মনে রেখেছি। তাদের নির্দয়তার কারণে তাদের জন্য আমাদের কোনো ভক্তি নেই। অনেক মা-বাবাও নিজেদের ছোট ছোট সন্তানের গায়ে হাত তোলেন। তারা বলেন, শিশুদের শেখাতে হলে কিছুটা শাস্তি তো দিতেই হয়। নাহলে বাচ্চারা শিখবে না। তাই বলে শাস্তি দেবেন মারধর করে? তারা বলেন, হ্যাঁ, করতেই হয়। এ কী রকম যুক্তি!
সম্প্রতি মাদ্রাসার এক শিক্ষককে একজন শিশুকে মারধর করার অপরাধে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। খুবই আনন্দের কথা। অপরাধী সাজা পেয়েছে। আমাদের কাজ শেষ। আমরা এবার এমন আরও ঘটনার জন্য অপেক্ষা করব এবং অপরাধীদের কথা জানতে পারলে তাদেরও বিচার করব। না, আমাদের কাজ শেষ নয়। যতদিন পর্যন্ত আমরা ছাত্রছাত্রীদের প্রতি শিক্ষকদের রাগ ভালোবাসায় রূপান্তরিত করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত আমরা মানসিকভাবে সুস্থ জাতি পাব না। যে মানুষটি শিশুকালেই নিগ্রহের শিকার হয়, সে কী মানসিকতা নিয়ে বড় হবে তা চিন্তা করা দরকার। শিশুকালের নিগ্রহ বয়সকালে কী প্রভাব ফেলে তাও জানা প্রয়োজন।
আমরা অনেক গণপ্রহারের ঘটনা দেখেছি। কেউ কিছু চুরি করেছে, তাই একদল মানুষ একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলল। চুরি করা কি প্রাণদণ্ড দেওয়ার মতো অপরাধ? যারা এই খুনে অংশ নিলেন, তারা সেই মৃত মানুষটিকে হয়তো চেনেনও না। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম; দেখলাম সবাই একজনকে মারছে; তাই আমিও মারলাম। অকারণে মানুষ গণপ্রহারে মারা যাচ্ছে। বিষয়টিকে এক ধরনের সামগ্রিক মস্তিস্ক বিকৃতি বলেই মনে হয়। এক ধরনের উগ্র মানসিক বিকলাঙ্গতা। আমার যখনই মনে হবে যে, আরেকজন মানুষকে আমার পেটানোর অধিকার আছে, এর অর্থ হচ্ছে, আমি নিজেই মানসিকভাবে সুস্থ নই।
আমাদের সমাজের পুলিশি হেফাজতের কথাই ধরুন। হেফাজত শব্দের অর্থ হচ্ছে- জিম্মায় বা তত্ত্বাবধানে রাখা। পুলিশ কাউকে রিমান্ডে নিয়ে গেলে তার সঙ্গে কী আচরণ করে তার অনেক গল্প আমরা শুনেছি। গল্পগুলো মিথ্যা নয়। রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। বেশিরভাগ সময় জিজ্ঞাসাবাদ মৌখিক হয় না; শারীরিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সভ্যতা এগিয়েছে কিন্তু শারীরিক কষ্ট না দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো পন্থা আবিস্কার হয়নি। অনেকেই আমরা আদর্শবাদী বা মায়াবাদী নই। অভিযুক্ত অপরাধীদের আমরা অবশ্যই মায়া প্রদর্শন করতে চাই না। তবে যে আইনের বলে তারা অভিযুক্ত, সেই আইন কী বলে? রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা যায়? নির্যাতন যদি জিজ্ঞাসাবাদের অস্ত্র হয়, তাহলে কি আমরা এখনও মধ্যযুগে আছি? এই একবিংশ শতাব্দীতে আমরা যখন অন্যান্য গ্রহে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি; অসংখ্য স্যাটেলাইট আমাদের গ্রহ প্রদক্ষিণ করছে, তখনও আমরা রোমানদের মতো, মধ্যযুগের মানুষের মতো বসবাস করব কেন? আচ্ছা, না হয় নির্যাতন করলাম। তাতে কি সমাজে অপরাধ কমেছে? এমতাবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে- অপরাধের উৎস তাহলে কোথায়?
দোষ স্বীকার করাতে যদি আমাদের নির্যাতন নামক অস্ত্রটিই বেছে নিতে হয়, তাহলে তো আমরা সেই মধ্যযুগেই বসবাস করছি! মানসিকভাবে পরিণত হইনি। ক’দিন আগেই এক খবরে দেখলাম, কোনো এক পাড়ায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য একদল ছেলে তাদের বিরোধী আধিপত্যবাদীদের হাতের কবজি চাকু দিয়ে কেটে নিয়েছে। এমন কাজ অনেক হাইজ্যাকারও করে। নিরীহ মানুষকে চাকু দিয়ে আঘাত করে, খুন করে। কল্পনা করুন, ওই বিরোধী আধিপত্যবাদীদের হাতেও লম্বা চাকু অথবা পিস্তল আছে। তাহলে কী হতে পারে? তারাও কতটা নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারে? অনুমান করা খুব কঠিন নয়। ওই মানুষদের যদি নিজেদের রক্ষা করার জন্য অস্ত্র হাতে থাকত বা অন্য কোনো ক্ষমতা থাকত, তাহলে এই নিষ্ঠুরতা তারা সহ্য করত না। তাই নয় কি? এই উত্তর নিশ্চই বায়ুমণ্ডলে উড়ছে।
আমাদের নিষ্ঠুরতার উদাহরণ অনেক আছে। এটুকু এই মুহূর্তে বলা যায়, আমাদের নিষ্ঠুর মানস মানুষ হিসেবে আমাদের দাবি নাকচ করে দেয়। আমরা বুঝতে পারি না যে, আমরা মানুষ এবং আমরা ভালোবাসতে পারি। আমরা যে নিষ্ঠুরতা অন্যের প্রতি প্রদর্শন করি, তা আমাদের অন্য কোনো দুঃখ থেকে প্রবাহিত হয়। অন্য কোনো সমস্যা যা আমাদের মনের গভীরে তলানির মতো জমে আছে। সেই তলানি আমাদের ঔদ্ধত্য পরিচর্যা করছে। মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি নির্দয় হতে ঠেলে দিচ্ছে। জানি না রাষ্ট্রের কাছে এর কোনো প্রতিকার পদ্ধতি জানা আছে কিনা। সমাজে নিষ্ঠুরতা বন্ধে রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে কিনা। হ্যাঁ, রাষ্ট্র এর প্রতিকার করতে পারে। আবার রাষ্ট্র নিজে নিষ্ঠুর হলে তা নাও করতে পারে। দূর থেকে যখন এমন নিষ্ঠুরতার দিকে তাকাই, আমাদের জাগ্রত সত্তা কোনো সান্ত্বনা পায় না।
প্রথম প্রকাশ – সমকালঃ https://samakal.com/editorial-subeditorial/article/210457818/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7

One Reply to “মানুষ বনাম মানুষ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *