ফটোঃ ব্র্যাক ব্যাংক

ছোটবেলায় একটি কবিতার কয়েকটি লাইন খুব ভাল লেগেছিল। কবির নাম মনে নেই। তবে তিনটি লাইন মনে আছেঃ
“জীবন খুব অল্পের জন্য সুখী,
আরও অল্পের জন্য অসুখী,
বাকি সবার জন্য অনিশ্চিত।“

কথাগুলো সার্বজনীন। কিন্তু কবি’র মত সাজিয়ে সবাই বলতে পারেন না। এসব কথা আমরা সারাক্ষণই বলছি। হাটে-মাঠে-ঘাটে। এবড়োথেবড়ো শব্দে। সুখ-দুঃখের গল্পই আমাদের মত সাধারণ মানুষের জীবনের প্রধান ভাবনার বিষয়, আলোচনার বিষয়। বলছি ঠিকই, আলোচনা করছি ঠিকই, তবে কেন যেন আমাদের দুঃখগুলোকে কিছুটা সুখে রূপান্তরিত করতে আমরা কার জন্যে যেন বসে থাকি। আশায় থাকি হঠাৎ করেই যেন দুঃখগুলো সুখ হয়ে যায়। আমরা আমাদের অনুঘটকের জন্যে অপেক্ষা করি। নিজেরা নিজেদের অনুঘটক হই না, নিজের সুখের জন্যে, নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে তেমন কিছু করি না। ধরেই নেই, আমাদের সেই বহু-প্রতিক্ষিত অনুঘটক কবে দেখা দেবেন এবং এসে আমাদের ভাগ্যে পরিবর্তন আনবেন।
এমন কয়েকজন অনুঘটকের দেখা আমাদের জীবনে মিলেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে আমাদের রাজনৈতিক অনুঘটক’কে পেয়েছিলাম। তাঁর ডাকে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা আমরা সবাই জানি।
তারপর পেয়েছিলাম কয়েকজন উন্নয়নের চালিকা শক্তিকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে প্রায় শুন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। না ছিল খাবার, না ছিল মানুষের বসবাসের জন্যে ঘরবাড়ি। একটি ভগ্ন অর্থনীতিকে আবার দাঁড় করাতে তখনকার সরকারের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের মানুষকে দেখাশোনা করাও সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আবার কেমন করে বেসরকারী উদ্যোগে দেশের মানুষকে সাহায্য করা যায়, তাও আমাদের জানা ছিল না।
আমাদের পথ দেখিয়েছিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তিনি ছিলেন সেই স্বপ্নদ্রষ্ট্রা অনুঘটক যিনি নিজের স্বপ্ন বাকি সবার মাঝে সঞ্চালিত করতে পেরেছিলেন। আজকের ব্র্যাক’এর যে কোন কর্মীর সাথে কথা বললেই বোঝা যায়, তারা স্যার আবেদের স্বপ্ন দ্বারা কতটুকু উদবুদ্ধ। বাংলাদেশের যেই মানুষই তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তারাই দেশের জন্যে কাজ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
স্যারের কাজের সাথে পরিচয় আমার অনেক দিনের, কিন্তু তাঁর সাথে মুখোমুখি পরিচয় খুব অল্প দিনের। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে মাঝে-মাঝে তাঁর সাথে দেখা হয়েছে, কিন্তু ভাল করে সাক্ষাৎ হয়েছে যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকে কাজ করতে আসি। সাদাসিদে মানুষ। নিজের জন্য চাওয়া একেবারেই নেই। তিনি যেই প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরী করেছিলেন সেগুলো কেমন করে টেকসই হবে এবং শুধু দেশে নয়, বিদেশেও পিছিয়ে পড়া মানুষকে কেমন করে সাহায্য করতে পারবে, তাই ছিল তাঁর চাওয়া।
স্যার ফজলে হাসান আবেদের সম্পর্ক ছিল মাটির সাথে, মানুষের সাথে, মাটির মানুষের সাথে। একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের মানুষের জন্যে তিনি যেমন ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনই তিনি এগিয়ে এসেছিলেন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে ব্যাংকিং সেবা দিতে এবং অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে। এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের তিনি ‘মিসিং মিডল’ বলতেন। যে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকরণের কথা আমরা এখন সব সময় বলছি, তা তিনি করে দেখিয়েছিলেন সেই স্বাধীনতার পর-পরই।
তিনি আন্তরিক ভাবে বিশ্বাস করতেন, পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নয়ন ছাড়া, বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তাঁর তৈরী করা আজকের এই ব্র্যাক ব্যাংক। এই ব্যাংকই বাংলাদেশের প্রথম এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের ব্যবসা করতে সাহস দিয়েছিল। এই ব্যাংকই প্রথম ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিনাশর্তে পাশে এসে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছে যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতই বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল শক্তি।
এঁরাই আমাদের দেশের সেই ‘মিসিং মিডল’। অর্থনীতিতে এঁদের অবদানই সবচেয়ে বেশি, কিন্তু এঁদের কেউ দেখতে পায় না, মূল্যায়ন করে না, এঁদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায় না। এঁদের জীবন অনিশ্চিত। এই অনিশ্চিত জীবন থেকেই স্যার আবেদ এই জনগোষ্ঠিকে বের করে এনে এক টেকসই নিশ্চয়তা দেয়ার চেষ্টা সারাজীবন করে গেছেন। তিনি ছিলেন সেই কবি যিনি এই জনগোষ্ঠির অনিশ্চয়তা পরিস্কার দেখতে পেয়েছিলেন এবং তা দূর করার সমাধান খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন।
নিজের কাজ দিয়ে তিনি যেই মাপের মানুষে পরিনত হয়েছিলেন, যেই সামর্থ অর্জন করেছিলেন, যেই প্রভাব তিনি সব ক্ষেত্রে ফেলতে পেরেছিলেন, হয়তো খুবই স্বাভাবিক ছিল রাজনীতিতে জড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু তা আমরা দেখি নি। উন্নয়ন ছিল তাঁর জীবনের ব্রত এবং সেই ব্রত থেকে বিচ্যুত হন নি কখনও। এবং তিনি এতো সুন্দর করে রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন যা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এখানেই তাঁর আরেক সাফল্য।
মানুষের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন, কিন্তু শুধু একপেশে উন্নয়ন নিয়ে তিনি চিন্তা করেন নি। একজন মানুষের অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অর্থ মানুষকে ভাল রাখতে পারে না। তার প্রয়োজন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশান, পুষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা – সব কিছু নিয়ে তিনি এক সামগ্রিক উন্নয়নের কথা ভেবেছেন।
আমরা জানি না তাঁর মত আরেকজন মানুষ এদেশে আবার কবে আবির্ভুত হবেন। স্যার আবেদের শিক্ষা আমাদের জন্যে পাথেও হয়ে থাকবে। তাঁর মত মানুষের শুধু আমাদের দেশে নয়, এই পৃথিবীতে অনেক প্রয়োজন। আমরা আশা করি তাঁর সাথে যারা কাজ করেছেন, তাঁকে যারা কাছ থেকে দেখে দীক্ষা নিয়েছেন, তারা সেই দীক্ষাকে পাথেও করে মানুষের জন্যে কাজ করবেন, দেশের জন্যে কাজ করবেন।
প্রথম প্রকাশঃ বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

হঠাৎ’ই শেখার শুরু

হঠাৎ দেখি ঘুমিয়েছি এক পৃ্থিবীতে জেগে উঠেছি আরেকটিতে ডিজনীতে আর কোন জাদু নেই প্যারিস রোমান্…