Photo: Google

‘#মি টু’ বাংলাদেশ!

‘#মি টু’ বানে ভেসে যাচ্ছে ভারত। প্রায় সারাদেশ থেকেই ‘#মি টু’ বিস্ফোরণে দেশের গণ্যমান্য ও বিখ্যাত পুরুষেরা কুপোকাত হচ্ছেন যৌন হেনস্থার অভিযোগে। একটি শব্দের এতো শক্তি! প্রথমে শুরু হয়েছিল হলিউডে। তারপর এলো বলিউডে। সেখানে সবকিছু ওলোটপালোট করে তোলপাড় করে দিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনে হানা দিয়েছে। নানা পাটেকর, বিকাশ বহেল, রজত কাপুর, আলোক নাথ, সাজিদ খান, কৈলাশ কের, অমিতাভ বচ্চন, এমজে আকবর, লাসিত মালিঙ্গা ও আরো অনেকে। এমজে আকবর তো তার মন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। শিল্পী নন্দিতা দাসের বাবা চিত্রশিল্পী যতীন দাসের বিরুদ্ধেও যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন নিশা বরা নামে এক নারী। নন্দিতা বলেছেন, ব্যাপারটি তার জন্য অস্বস্তিকর তবে তিনি অভিযোগকারীদের পাশে থাকবেন। ওদিকে অভিযোগকারী মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ভারতের শিশু কল্যাণমন্ত্রী মানেকা গান্ধী। নির্যাতিতাদের সব রকম সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কমিটিও গঠন করে ফেলেছেন তিনি।

ইতিহাসে এর আগে কোনো নারী বা নারীসকল মিলে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন কিনা আমরা জানি না। হয়তো হয়েছে। ইতিহাস তা লিপিবদ্ধ করেনি বা করতে চায়নি। প্রায় সব লিপিকারই পুরুষ। কেউ কেউ একা একা এমন অভিযোগ এনেছেন, তবে সেই নারীকেই দুষ্টু বলে সমাজ গালি দিয়েছে। বাংলাদেশেও হয়েছে। আমরা তাদের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তাকেই দোষারোপ করেছি। হয়তো এমন অভিযোগ প্রত্যেকটি দেশেই, সকল সমাজেই মাঝে-মাঝেই জনসম্মুখে এসেছে তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

যারা এমন অভিযোগ আনছেন তারা প্রায় সবাই চিত্রলোকের মানুষ। কয়েকজন সাংবাদিকও আছেন। তারা যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনলে তা খবর হয়ে গনমাধ্যমে আসে। আমাদের দেশেও যদি কোনো চিত্রনায়িকা এ অভিযোগ আনেন তাও খবর হবে। তবে একজন পোষাক শ্রমিক যদি এমন অভিযোগ আনেন তাহলে কি হতে পারে? সে খবর কি কেউ ছাপবে? ছাপলেও কেউ কি তা পড়বে বা আমলে নেবে? ধরেই নেবে এমনতো সবসময়ই হয়।

‘সবসময়’শব্দটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যৌন হেনস্থা এক ধরণের অত্যাচার। অসভ্যতা। যেমন মিথ্যাচার একটি অসভ্যতা। তবে মিথ্যাচার যখন আচারে পরিণত হয় তা সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। তেমনই হয়েছে যৌন হেনস্থার বেলায়।

ছোটবেলা থেকে রূপকথায় পড়ে এসেছি রাজপুত্র ঘুমন্ত রাজকন্যাকে চুমু দেওয়ার গল্প। তার অর্থ হচ্ছে অনুমতি ছাড়াই একজন নারীর ওপর যৌনকর্ম চালানো। এই চুমুটি গণমাধ্যম, শিল্প-সাহিত্যে এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেন রাজকন্যার জন্যে তা এক আশীর্বাদ। আসলে কি তাই? রাজকন্যা কি চেয়েছেন যে একজন অপরিচিত রাজকুমার তাকে চুমু দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে আরো অন্যান্য যৌনকর্মের আহবান জানাক? এই ‘ঘুম’ বিষয়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ কি তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখছে? যৌনকর্ম সাধনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। রাজকন্যা অন্য কোনো পাপ করেছিল এবং সেই পাপের শাস্তি হিসেবে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল কেউ? নাকি কোনো ভিলেনের সঙ্গে যৌনকর্মে রাজী না হওয়ায় তাকে সেই ভিলেন ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল?

#মি টু আন্দোলনের কথা আলোচনায় এলেই আমাদের দেশের প্রসঙ্গটি চলে আসে। আমাদের দেশে কি এমন যৌন হেনস্থা নেই। অভদ্র পুরুষরা যৌন হেনস্থা চালিয়ে যাচ্ছেন তা আমরা জানি। তবে আমরা যারা নিজদেরকে ভদ্র ও সভ্য বলে দাবী করি তারা? প্রশ্ন করতেই কেউ কেউ বললেন এটি নাকি আমাদের সমস্যা নয়। আচ্ছা। তারা কেমন করে জানেন যে এটি আমাদের সমস্যা নয়? ‘আমাদের সমস্যা নয়’- এ উত্তর পুরুষদের। কোনো নারী আমায় এ উত্তর দেননি। তারা বলেছেন, ‘আমাদের নারীরা এখনও সবাই গৃহবধু; তারা লজ্জায় কেউ বলতে চাইবেন না; বাংলাদেশে এখনও সে সময় আসেনি যে কেউ সমাজের চোখ রাঙানো উপেক্ষা করে কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবেন’।

হতে পারে। ওইযে বললাম। ঘুম! আমাদের নারীদের আমরা ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি বলেই আমার মনে হয়। তবে এই ঘুম ভাঙবে। এটি এখন শুধু সময়ের ব্যপার। আমাদের দেশের নারীদের এই লজ্জার ঘুম ভাঙলে কিন্তু পুরুষদের লজ্জায় জেগে থাকা কষ্টকর হবে।

যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে এমন একটি আন্দোলনের খুবই প্রয়োজন এখন।

প্রথম প্রকাশঃ বার্তা২৪…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *