মুহিব্বুল আবরারঃ তুই কিডা?

ক্যাডেট কলেজ এক অদ্ভুত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হরেক রকম অদ্ভুত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে ছেলেমেয়েদের পথ চলতে হয়। বলা যেতে পারে এ এক অভিজ্ঞতার কারখানা। অনেক অভিজ্ঞতার মাঝে একটি হচ্ছে একদল বন্ধু তৈরি হওয়ার অভিজ্ঞতা। ক্যাডেট কলেজে পড়ালেখা করার ছয় বছরে বন্ধুত্বে অনেক ভাঙ্গাগড়া এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে দিগবিদিক ছোটাছুটি করে। তারপর সেই বন্ধুত্ব কাদামাটি থেকে এক মৃৎশৈল্পিক রূপ পায়। অনেক কাদামাটি ঝরে যায়। শুধু তারাই রয়ে যায় যাদের প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য আছে। সে আবার কি? বলছি। বারো হাজার বছর ধরে যেই বস্তু মাটির নীচে চাপা থাকার পর বিজ্ঞানীরা যখন তা খুঁড়ে বের করেন, দেখা যায় তার রূপ ও চরিত্র সেই আগের মতই আছে। একটু অন্যভাবে বলি। অংকশাস্ত্রে যেমন অ্যালজেবরার কমোন আছে তেমন।

মুহিব্বুল আবরার তেমন একজন। সেই বারো হাজার বছর আগে যেমন ছিল, তেমন।

এখানে বলে রাখা ভাল যে ক্যাডেট কলেজে বন্ধু সাথে বন্ধুর প্রতিযোগিতা শেখানো হয়। প্রতিযোগিতার অর্থ হচ্ছে সংঘাৎ। একেবারেই ভাল লাগতো না। এখনও লাগে না। তবে কেউ আমায় প্রতিযোগী মনে করলে তাকে জানিয়ে দিই আমি যুদ্ধ চাই না কিন্তু তিনি রাজি না হলে যুদ্ধ ছাড়া উপায় থাকে না।

ক্যাডেট কলেজে আমার মার্কা ছিল “ব্যাড-অ্যাস্”। ব্যাড-অ্যাস্দের মস্তিস্কের রসায়ন বোধহয় একেকজনের একেক রকম ছিল। আমাদের শিক্ষকরা সেই রসায়ন বুঝতেন না। ব্যাড-অ্যাস্-এর অর্থ অনেক। আমার কাছে যা ভাল লাগে তা হচ্ছে ‘বিদ্রোহী’ বা ‘প্রথাত্যাগী’। কলেজে এর অর্থ ছিল ‘খারাপ’। ব্যাড-অ্যাস্, বিদ্রোহী, প্রথাত্যাগী, খারাপ। ক-কলেজ বিদ্রোহীদের খারাপ বলতো।

আমি আসলে খারাপ ছিলাম না, প্রথাত্যাগী ছিলাম।

আমার মত আরও কেউ কেউ ছিল। কেউ পড়াশোনা পারে না [বা পড়তে চায় না], কেউ খেলা পারে না [বা খেলতে চায় না], কেউ মুখস্ত করতে পারে না [বা করতে চায় না] – এমন অনেকে।

তা হলে চলবে কি করে, বাবা ইকরাম? প্রথা তো প্রথাই। প্রথাই বাইবেল, প্রথাই কোরান, প্রথাই জীবন।

যে পদ্ধতি আবিস্কার হয়েছে এবং শত বছর ধরে চলছে, সেই সমীকরণেরই ক্যাডেট জীবন চালিয়ে যেতে হবে।

আবরার সব প্রথাই মেনে চলছিল। পড়ালেখায় সে সেরাদের একজন। খেলায়? সে খেলাধুলা করে, তবে না খেললেও তার চলে, কিন্তু তার খেলায় অনিচ্ছাকে কেউ তাকে প্রথাভঙ্গকারী মনে করে না। আমাকে মনে করে। না পড়লে সে ‘প্রথাভঙ্গকারী ইকরাম’। ওকে ধরো। ওকে মারো। [কেন প্রথা ভাঙ্গতে চাই সেই গল্প আরেকদিন]।

ইকরাম, ফেরদৌস, মিখাইল পড়ালেখায় ভাল না। মনে মুনিরও ভাল ছিল না। মনে আছে আগেই বলেছি ক্যাডেট কলেজ এক বন্ধুর সাথে আরেক বন্ধুকে প্রতিযোগিতায় প্রলুব্ধ করতো? রাতে প্রেপ-এর [preparation time] আড়াই ঘন্টায় ভাল ছাত্রদের কেউ কেউ তাদের প্রেপারেশান শেষ করে চারিদিকে তাকিয়ে দেখতো অন্যান্য ভাল’রা কি করছে। ভাল’রা সবাই পড়ছে তো পড়ছেই। তখন এই ভাল’রা গিয়ে ঐ ভাল’দের পড়ায় ব্যাঘাৎ ঘটাতো। চিন্তা করুন। একবার চিন্তা করুন। এরা অনেক বুদ্ধিমান ছিল। এখনো তাই। আমাদের কলেজ যেই প্রতিযোগিতা শেখাতে চাইছিল, তা তারা খুব ভালই শিখেছিল। এখনও সেই প্রতিযোগিতা চলছে তো চলছেই…

মুহিব্বুল আবরার ছিল ভাল’দের মধ্যে একেবারেই অন্যরকম। তার পড়াও অনেক আগেই শেষ হত। তবে সে অন্য ভাল’দের বিরক্ত করতো না। সে জানতো পরীক্ষায় কত নম্বর পাবে। আমার মত খারাপ’দের কাছে এসে জানতে চাইতো আমরা কি করছি। পড়ছি কিনা। অংকগুলো হচ্ছে কিনা। না বুঝলে খাতা টেনে নিয়ে অংক করে দেখাতো। বাংলা-ইংরেজী না বুঝলে তাও দেখাতো। নবম শ্রেনীতে বাংলা-ইংরেজীতে অনেক লিখতে হত। আমাকে কোন শিক্ষকই পাস করাতেন না। কারণ ইকরাম ‘খারাপ’।

মুহিব্বুলের কয়েকটা ইয়া মোটা বাইন্ড [খুলনা বাইন্ডিং] করা খাতা ছিল। মলাটে সবুজ রঙের মধ্যে ঢেউ-ঢেউ নক্সা। মলাটে সাইন-পেন দিয়ে লেখা থাকতো ৮৪৭। একটু স্কেচ করার চেষ্টা ছিল। তবে মুহিব্বুল অংকনে ‘খারাপ’ ছিল। সে তার প্রতিযোগিদের ঐ নোটখাতা দেখাতো না; বস্তায় লুকিয়ে রাখতো। তবে আমাকে, ফেরদৌসকে, মিখাইলকে এবং মুনিরকে দিতো দেখে-দেখে টুকে রাখার জন্যে। ওর লেখা লেখা থেকে মুখস্ত করার জন্যে। ফেরদৌস-মিখাইল [মুনিরের কথা মনে নেই] হয়তো করতো; আমিও চেষ্টা করেছি, তবে পরক্ষনেই মনে হয়েছে – ‘বা…, শা…; তুই কিডা…?’

ওকে বা…শা… বলেছিলাম বটে, তবে আমার মত ‘সুবিধাবঞ্চিত’-দের জন্যে তার ভালবাসা আমার আজও মনে আছে।

গ্রীক পূরাণে বলে, বন্ধু নাকি মায়ের পেটের ভাইয়ের চেয়েও বেশি আপন। মুহিব্বুল একজন গ্রেইসান বন্ধু…

**এ লেখায় বানান ভুল থাকবেই। ভুল হলে, নিজের মত করে ঠিক করে পড়ে নেয়ার অনুরোধ রইলো। বাংলায় ফেল করলাম কিনা সেই যন্ত্রনা এখন আর আমার নেই…

3 Replies to “মুহিব্বুল আবরারঃ তুই কিডা?”

  1. দোস্ত একরাম, এক নিমেষেই পড়ে ফেল্লাম। লেখায় গতি আছে. সাবলিলতা আছে। খুবই ভালো লেগেছে। প্রতি ব্যাচেই আবরার, একরামরা থাকে।সবাইকে নিয়েই তে আমরা মহা আনন্দে ৬ টা বছর কাটিয়েছি। বেলাশেষে আজও তাই গন্ডিবদ্ধ ক্যাডেট জীবন সবাইকে পিছু টানে। ধন্যবাদ তোকে বন্ধু ।
    মোনায়েম/১৫/অরকা

  2. প্রথাবিরুদ্ধ লেখা।ভালো লাগলো।আমাদের এই মেধাবি বন্ধুটি ডাক্তার হ’লেও,প্রথাগত বিশেষজ্ঞ হয়নি।সেরা ছাত্র হয়েও অহংকার অহমিকা তাঁকে স্পর্শ করেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *