মোয়াজ্জেম হোসেনের সাথে...

মোয়াজ্জেম হোসেন স্মরণে

তাঁকে সাথে পরিচয় হয়েছিল  ’৯১ সালে। আমি ডেইলি স্টারে কাজ করি এবং তিনি ডেইলি টেলিগ্রাফে। তখন মেলামেশা হয়নি। তাঁকে সেভাবে চেনা হয়নি। তাঁর সাথে সত্যিকার পরিচয় হলো যখন সাবির মুস্তাফার আহ্বানে ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় কাজ করতে যাই ’৯৩ সালে। কাজ শুরু করেছিলাম সম্পাদকীয় সহকারী হিসেবে। আমাদের দায়িত্ব ছিল প্রতিদিনের সম্পাদকীয় পাতা এবং সপ্তাহান্তে ম্যাগাজিনের চারপাতা প্রকাশ করা। নতুন কাগজ, তাও আবার অর্থনীতি বিষয়ক! কে আমাদের পত্রিকায় লিখবেন আর কে লিখবেন না, তা নিয়ে অনেক সংশয়। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন সারাক্ষণই অভয় দিয়ে যাচ্ছেন। আমায় ডাকতেন মুন্না বলে। বলতেন, ‘মুন্না, চিন্তা করবেন না; ধীরে-ধীরে সবাই আমাদের এখানে লিখতে চাইবে। প্রথম-প্রথম এই কষ্টটুকু মেনে নিন’।
আমার প্রতিদিনের কাজের মধ্যে একটি ছিল সম্পাদকীয়’র কপি নিয়ে তাঁর সাথে বসা। তাঁর সামনে বসে তাঁর সম্পাদনা দেখতে-দেখতে অনেকটাই শিখে ফেললাম কেমন করে সম্পাদকীয় লিখতে ও সম্পাদনা করতে হয়। তাঁর ইংরেজির জ্ঞান দেখে আমি অবাক হতাম। বিদেশি একটি ভাষার ওপর এমন দখল আমাদের পেশায় খুব কম মানুষের আছে। এখন পর্যন্ত আমি মোয়াজ্জেম ভাইয়ের চেয়ে ভালো লেখক খুব কম দেখি। শুধু ভাষা নয়; অর্থ- বা ব্যবসা-সাংবাদিকতার এমন গভীর জ্ঞান এবং জ্ঞানের স্পষ্টতা আর কারও মানসে দেখি নি। নিজে কোনও দিন একটি অর্থনীতি বিষয়ক কাগজে কাজ করবো ভাবিনি।

ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এ কাজ শুরু করেছিলাম ভয়ে-ভয়ে। জীবনে কোনও দিন অর্থনীতি পড়িনি, কলেজে বিজ্ঞান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য পড়েছি। লক্ষ্য করলাম, সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হচ্ছে সারাক্ষণ আমাদের সম্পাদককে লক্ষ করা। তিনি কেমন করে অর্থনীতির বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন, কোথায় কোন শব্দ ব্যবহার করেন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নতুন-বাজার অর্থনীতি, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ–এই সবকিছু নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলে বেশ বড়সড় উত্তর মিলতো। সেখান থেকেই আমার ব্যবসা-সংক্রান্ত সাংবাদিকতা শেখা।

বাংলাদেশে ব্যবসা-বিষয়ক কাগজ চলতে পারে তা তিনিই সবাইকে শিখিয়েছিলেন। আমরা লক্ষ করেছি, ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস বাজারে আসার আগে ব্যবসা-বিষয়ক প্রতিবেদকদের মধ্যে এক ধরনের গাছাড়া ভাব ছিল। ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস গোলাপি রং নিয়ে বাজারে এসে সবার মধ্যে এক প্রতিযোগিতা তৈরি করেছিল। অন্যান্য সব পত্রিকা, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার পত্রিকাগুলো, ব্যবসা-সংক্রান্ত রিপোর্টিংয়ের ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া শুরু করলো। এতে করে রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসার উন্নয়ন, প্রসার এবং অসঙ্গতিগুলো প্রাধান্য পেয়ে আরও অনেক শক্তি সঞ্চয় করলো। এক্ষেত্রে মোয়াজ্জেম হোসেনের অবদান ভোলার নয়। তাঁকে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা সারা জীবন মনে রাখবেন।

মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের ছেড়ে ১লা আগস্ট দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। এমন মেধাবী একজন মানুষ এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন আমরা কখনও ভাবিনি।

তাঁর স্মরণে আজ অনেক কিছুই মনে পড়ছে। শুধু দু-একটি কথা উল্লেখ করতে চাই, যা আমার মননে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। তাঁর সাথে কাজ করতে করতে আমি তাঁর বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলাম। কতটা বিশ্বাসভাজন হয়েছিলাম, তা আমি নিজেও বুঝি নি। তবে বুঝেছিলাম ২০০৩ সালের শেষের দিকে। আমি তখন ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ কাজ করছি বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবে। অনেক কাজের মাঝে প্রতি সপ্তাহে একটি করে উপসম্পাদকীয় লেখাও আমার কাজ ছিল। ঈদের ছুটি হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের দিন আমার লেখা জমা দেয়ার কথা। অন্যান্য কাজের ভিড়ে লিখতে পারলাম না। মোয়াজ্জেম ভাইকে অনুরোধ করলাম যে আমি আজ দিতে পারবো না এবং আমি ঈদের ছুটি কাটিয়ে এসেই দুটি লেখা তাঁকে দেবো। তিনি রাজি হলেন। আমি মহাখুশি। আমার দেখাদেখি আমাদের আরেক সহকর্মী আমার মতো একই অনুরোধ করলেন। তার উত্তরে মোয়াজ্জেম ভাই বললেন, ‘না, আপনাকে আজই দিতে হবে; মুন্না বললে আমি বিশ্বাস করতে পারি’।

আমার সহকর্মীর চেহারা কালো হয়ে গেল। সম্পাদক হিসেবে মোয়াজ্জেম ভাইয়ের একথা তাকে বলা হয়তো ঠিক হয়নি, তবে আমি সেদিন বুঝে গেলাম আমার সম্পাদক আমাকে কতখানি বিশ্বাস করেন। আমার পুরো সাংবাদিকতা পেশা-জীবনে আমি এতো সম্মানিতবোধ আর কখনও করিনি।

তার এই বিশ্বাসের প্রতিদান আমিও দিয়েছিলাম। প্রকাশনা বার্ষিকী উপলক্ষে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করার আয়োজন চলছে। সেই একই বছরে। অনেক লেখা জোগাড় হয়েছে। অনেক বিজ্ঞাপনও জোগাড় হয়েছে। প্রকাশনার তারিখ স্থির হয়েছে। বিজ্ঞাপনদাতাদের সাথে তেমনই কথা হয়েছে। ওই তারিখের পর ছাপলে অনেক বিজ্ঞাপণদাতা ফিরে যাবেন। এদিকে আমাদের সাংবাদিক-কর্মচারী ইউনিয়ন দাবি নিয়ে এসেছে যে প্রকাশনা বার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের সবাইকে বোনাস দিতে হবে। যত অর্থ আমাদের ইউনিয়ন বোনাস হিসেবে দাবি করছিল, তা দেয়া আমাদের অফিসের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

ইউনিয়ন নেতারা আমাদের সবাইকে ক্রোড়পত্রের জন্য কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। সবার সামনে আমরা কাজ না করতে রাজি হলাম। কিন্তু মোয়াজ্জেম ভাইকে গিয়ে বললাম, আমাকে লেখাগুলোর সব সফটকপি দেয়ার ব্যবস্থা করতে। তিনি দিলেন। আমি রাত জেগে বেশ ক’দিন ধরে তা সম্পাদনা করে তাঁর কাছে ফেরত দিলাম। তিনি শেষবারের মতো সেগুলো দেখে প্রকাশনার জন্য প্রস্তুত করে রাখলেন। এদিকে প্রকাশনার তারিখ এগিয়ে আসছে, কিন্তু ইউনিয়নের সাথে আলোচনায় কোনও দফারফা হচ্ছে না।

অবশেষে আমি ইউনিয়ন নেতাদের কাছে গিয়ে অনুরোধ করলাম আমাদের অফিস যা দিতে চাইছে তাতে রাজি হয়ে যাওয়ার জন্য। নেতাদের কয়েকজন একটু ইতস্তত করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আমার অনুরোধে রাজি হলেন একেবারে শেষ দিনে। রাত নয়টার সময় ইউনিয়নের সাথে সন্ধি হলো এবং আমি আমার কাজ শুরু করলাম তখনই। দুজন কম্পিউটার মেকআপম্যান এবং তিনজন পেস্টারকে নিয়ে কাজ করে ভোর দুটোর সময় পুরো কাজ শেষ করে প্রেসে পাঠিয়ে দিলাম। সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনও আমাদের সাথে রাত ১২টা পর্যন্ত ছিলেন। পরদিন তিনি যে ভাষায় আমায় ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন, তা আমার সারা জীবন মনে থাকবে।

আমি মোয়াজ্জেম হোসেনের ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ দুবার কাজ করেছি। প্রথমবার তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন কি করে ব্যবসা-বিষয়ক লেখা ও প্রতিবেদন সম্পাদনা করতে হয় আর পরেরবার শিখিয়েছিলেন কি করে লিখতে হয়। তিনি আমাকে অনেক মনোযোগ দিয়ে লেখা শিখিয়েছেন। আমি তাঁর কাছে সারা জীবন ঋণগ্রস্ত হয়ে থাকবো। সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয়টি হচ্ছে, আমি যে তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকবো তা আমি তাঁর জীবদ্দশায় জানিয়ে দিতে পেরেছিলাম।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা ট্রিবিউন – http://www.banglatribune.com/others/news/350681/%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%AE-%E0%A6%B9%E0%A7%8B%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%87

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *