Photo: banglainsider.com

লেগুনা, রিক্সা ও মাদক

শহরে লেগুনা চলাচল বন্ধ করা হবে শুনে মনে খটকা লেগেছিল। আসলেই করবে? করা কি ঠিক হবে? তাহলে যেই মানুষগুলো লেগুনা চালিয়ে জীবিকা চালায়, তাদের কি হবে? কোথায় যাবে তারা? কি করবে তারা? তারপর শুনি আমাদের প্রধান-প্রধান সড়কে লেগুনা চলতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ’শহরে সড়ক আছেই বা ক’টা? সবইতো প্রধান সড়ক। লেগুনা চলাচল শহরের ট্র্যাফিক-সহ আরও অন্যান্য ব্যপারে জ্বালাতন করছে ঠিকই, তবে প্রশ্ন হচ্ছেঃ লেগুনাগুলো যখন আমাদের রাস্তায় চলাচল শুরু করেছিল, তখন আমরা কোথায় ছিলাম? আমাদের চিন্তাবিদরা কোথায় ছিলেন? এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল অনেক বছর আগে। প্রায়ই হতো। আমরা ঢাকার রাস্তা থেকে রিক্সা তুলে দিতে চাইতাম। রিক্সা চলাচল বন্ধ করে দিয়ে যখন দেখলাম আসলে কাজটি ঠিক হয় নি, তারপর আবার চালু করলাম। যেই মানুষগুলো রিক্সা চালিয়ে জীবন চালাতেন, তাদের কথা চিন্তা করেই আবার চালু করলাম।

যখন রিক্সা এবং লেগুনা আমাদের সড়কগুলতে চলাচল শুরু করে, তখনই আমাদের বোঝা উচিৎ ছিল যে এই বাহনগুলোকে ঘিরে একটি অর্থনীতি তৈরী হবে এবং সেই অর্থনীতিতে জনগন অভ্যস্থ হয়ে গেলে বাহনগুলো রাস্তা থেকে আর সরিয়ে ফেলা যাবে না। যদি সরাতেই হয়, তাহলে মানুষগুলোর কোন একটি গতি নির্ধারণ করে তারপর তা করতে হবে। আমাদের কাজ দেখলে কেন যেনো মনে হয়, মাথা ব্যাথায় মাথা কেটে ফেলতে চাই।

মাথা ব্যাথার কথা মনে হলেই মাদকবিরোধী অভিযানের কথা মনে হয়। বেশ কয়েক মাস ধরে এই অভিযান চলছে এবং নানা ধরণের মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশের সাথে বন্ধুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে। অবাক হয়েছি এই অভিযানে প্রাণহানির পক্ষে একজন পুলিশ কমিশনারের কথা শুনে। পত্রিকান্তরে জেনেছি যে তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, জীবনহানি হতেই হবে। শান্তির জন্য অশান্তির জীবনহানি হতে পারে।’ তিনি আরও বলেছেন যে মাদক ব্যবসায়ীরা অস্ত্র হাতে নিয়ে পুলিশের সাথে মোকাবেলা করতে চায়; তবে পুলিশের হাতেও অস্ত্র আছে। সেই অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার পুলিশের আছে। সুতরাং মাদক নিয়ন্ত্রণে জীবনহানি হতেই পারে। কথা সত্য। কেউ পুলিশের দিকে গুলি ছুঁড়লে পুলিশ কেন দাঁড়িয়ে থেকে গুলি খাবে? তারাও পালটা গুলি করবে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এ পর্যন্ত কতজন মাদক ব্যবসায়ী মারা গেছে? দু’শ? আড়াই’শ? তার অর্থ হচ্ছে ওদের সবার হাতে অস্ত্র ছিল এবং পুলিশের দিকে তারা গুলি করেছে। তাহলে দু’শ-আড়াই’শ বাংলাদেশী খোলা বন্দুক হাতে স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে? চিন্তা করুন এই আড়াই’শ বন্ধুকধারী যদি কোথাও একসাথে জড়ো হয়ে আড়াই’শ বন্দুক দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে, তাহলে আমাদের পুলিশের কি হতে পারে? আর বন্দুকগুলো নিশ্চয়ই অবৈধ। আমাদের’তো সবার আগে ঐ অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা প্রয়োজন!

আমাদের পুলিশ কমিশনার ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার জন্য বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, ‘১২০ কিলোমিটার সীমান্ত যদি আমরা রক্ষা করতে পারতাম তাহলে ইয়াবা দেশে ছড়িয়ে পড়তো না। সীমান্তের একটি পয়েন্টে যদি ১০ লাখ ইয়াবা ঠেকানো যেত, তাহলে সেগুলো ১০০ জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো না। এক পয়েন্টে ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ সহজ নাকি ১০০ পয়েন্টে?’

কমিশনার আরও বলেছেন যে সবাই পুলিশকে দোষ দেয়, তবে পুলিশের কারণে মাদক দেশে আসে না। তিনি বলেছেন, ‘যাদের ব্যর্থতার কারণে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে তাদের নাম কেউ মুখে আনে না। দুঃখের বিষয় তাদের কথা মিডিয়াতেও আসে না।’ তিনি দাবি করেছেন যে বিজিবি ও কোস্টগার্ডকেও ব্যর্থতার দায় নিতে হবে।

আমাদের মত সাধারণ মানুষের মস্তিস্ক বিগড়ে যাওয়ারই কথা। সরকারের একটি বাহিনী অন্য দু’টি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছে? এমনই কি হওয়ার কথা? আমাদের পুলিশ আমাদেরই সীমান্তরক্ষী ও কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে কথা বলছে? যেন সীমান্তরক্ষী ও কোস্টগার্ডই দেশে মাদক নিয়ে আসছে এবং তাদেরকেই দোষারোপ করা উচিৎ। বুঝে নেবো যে এ বিষয়ে পুলিশকে দায়নস্ত করা কারোরই ঠিক হচ্ছে না। এবং পুলিশকে শুধু দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে কঠোর হওয়ার জন্যে?

এমন অবস্থায় আমাদের মত সাধারণ মানুষের বুদ্ধি লোপ পায় এবং এমন বুদ্ধিহীন পরিস্থিতিতে আমরা লেগুনা ও রিক্সায় চড়তে চাইতেই পারি। নয় কি?

আমরা কাউকে দোষ দিতে চাইনা। সমাজে মাদক আল্প-বিস্তর সব সময়েই ছিল, আছে এবং থাকবে। তবে সেটিকে আয়ত্তের ভেতরের রাখাটাই হচ্ছে আমাদের স্বার্থকতা। শুরুতেই যদি আমরা মাদক নিয়ন্ত্রন (নাকি নির্মূল?) করতে চাইতাম, তাহলে আজ এমন অবস্থা হতো না। দোষ কারো একার নয়, আমাদের সবার। সবারই উচিৎ একসাথে চিন্তা ও কাজ করা।

প্রথম প্রকাশ বার্তা২৪’এঃ – https://www.barta24.com/details/যুক্তিতর্ক/10794/লেগুনা-রিক্সা#

ছবিঃ banglainsider.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *