Photo: Google

আলোর সামনে বসে আছে জয়তী। চুল আঁচড়াচ্ছে। বুকের কাপড়টা ঘাড় থেকে পিছলে বুকের মাঝে কোনোমতে বিঁধে রয়েছে। জয়তীর বুকের ছোট ছোট সোনালী লোম আর লোমকুপগুলো দেখা যাচ্ছে। মাটিতে নতুন ঘাসের মতো। আলো পড়াতে সেগুলো আরও উজ্জ্বল লাগছে। জয়তীর নিঃশ্বাসের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে তার বুকটাও ওঠানামা করছে। সোনায় ঝলসানো লোমগুলোর দিকে শুভ অপলক তাকিয়ে আছে। চেষ্টা করেও পলক ফেলতে পারছে না-পাছে এই দৃশ্য জীবনে আর যদি ফিরে না আসে! তাছাড়া সে জানে এমন দৃশ্য চোখে পড়ার পর পলক ফেলতে নেই। ওতে সৃষ্টিকর্তা রাগান্বিত হতে পারেন। শুভ বিশ্বাস করে, ঈশ্বর নিজের হাতে গড়েছেন জয়তীকে।

প্রায়ই এরকম হয়। মাঝে মাঝে জয়তীর শরীরে কোনো না কোনো পাগল করা ব্যাপার সে নতুন করে আবিষ্কার করে। তখন দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। নড়ে না। তার নিজের শরীরে রক্ত চলাচল তখন অস্বাভাবিকতার দিকে ছোটে। তখন জয়তীর দিকে তাকিয়ে থাকা দুষ্কর হয়ে ওঠে। তখন চোখবুঁজে জয়তীকে ছুঁতে ইচ্ছে করে। যেনতেন ছোঁয়া নয়; পাগলের মতো ছোঁয়া।

জয়তীর কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে নিজের বাড়ির গলিতে ঢুকে পড়েছে শুভ বোঝেনি। যখন বুঝলো, দেখল সে নিজের অজান্তেই গাড়ির গতি কমিয়ে ফেলেছে। দিনশেষে ফেরার পথে বাড়ির গলিতে ঢুকলেই সে গাড়ির গতি কমিয়ে দেয়। একেবারে দশ কিলোমিটারে নামিয়ে আনে। এই গতিতে রাস্তার অর্ধেক জুড়ে গাড়ি চালালে পেছন থেকে আসা গাড়িগুলোর খুব অসুবিধা হয়। উন্মাদের মতো তারা হর্ন বাজাতে থাকে। কতদিন বিরক্তিভরে কত ড্রাইভার তাকে গালি দিয়ে গেছে তার ঠিক নেই।

শুভ তোয়াক্কা করে না। এটা ‘তার’ বাড়ির গলি। এখানে সে তার ইচ্ছেমত গতিতে গাড়ি চালাবে।

দুটো কারণে সে এটি করে-গলির মুখে বাঁক নিলেই যে বাড়িটি ডানদিকে প্রথম চোখে পড়ে, সেখানে দুটো আম গাছ আছে। হালিম চাচার বাড়ির গাছ। তার নিজের হাতে লাগানো। ত্রিশ বছর আগে বাড়ি বানানোর সময়ই হালিম চাচা গাছ দুটো লাগিয়েছিলেন। এ দুটো যেন সেই থেকে তার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। দিনের বেলা সাধারণ গাছ মনে হলেও, সাঁঝবেলা এরা যেন একটা অশরীরী জীবন পায়। পাতাগুলোতে আশ্চর্য রকমের দু্যতি আছে। চাঁদের আলোতে, এমন কি তারার মিটিমিটি আলোতেও সে পাতাগুলোকে চকচক করতে দেখেছে; কিলবিল করতে দেখেছে।

গাড়ির গতি কমিয়ে আম গাছ দুটোর দিকে তাকালে সে নিজের মনের মধ্যে একটা অমোঘ গতি অনুভব করে। জয়তীর দিকে-নিজের বাড়ির দিকে ছুটে যাওয়ার গতি।

তাছাড়া গতি কমিয়ে অনুভব করতে চায় যে এক রাজপুত্র অনেক দূর থেকে রাজ্যে ফিরছে তার রাজকন্যার কাছে।
কিন্তু আজকে যেন শুভ তার গতি একটু বেশিই কমিয়ে দিয়েছে। গাড়ি থেমে যায় যায় অবস্থা। হালিম চাচার বাড়ির আম গাছ দুটো আজ তার মনে দোলা দিতে পারল না। এর অর্থ কি? তার বাড়ি ফেরার গতিতে কি তাহলে বাধা পড়েছে? জয়তী কি তার ওপর এখনো রেগে আছে? এমন দিনে তাদের দুজনের একটিবারও কথা হয়নি। একজন ফোন করলেই হতো। একজন মানে তো জয়তী। রাগারাগি হলে জয়তীই আগে ফোন করে। কিন্তু তার দিক থেকেও তো কোনো সাড়াশব্দ নেই। সারাদিন শুভ অনেকবার ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল। এই বুঝি বাজল! বাজেনি। নিজেও করেনি।
কিন্তু আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী।

এমন দিনে তাদের কথা হবে না? এ অবস্থার সূত্রপাত কদিন আগে থেকে।

শুভ বরাবর দেশজ রীতিনীতি, শিল্প-সাহিত্যের ভক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হাত-খরচের পয়সা বাঁচিয়ে চারুকলায় গিয়ে ষড়ঋতুর ছবি আঁকিয়ে এনে বাঁধিয়ে তার ঘরে রেখেছিল। নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা তার ঘরের দরজায় লিখে রেখেছিল। তবে এদের কবিতার সঙ্গে সমান সারিতে লেখা ছিল শেঙ্পিয়ার আর রবার্ট ফ্রস্টের কবিতাও। ছোটবেলা থেকেই বৈশ্বিক চাপটা শুভ অনুভব করে, আমেরিকা আর রাশিয়ার ঠাণ্ডা যুদ্ধের প্রখরতা সে প্রথম টের পেয়েছিল ভাষা আর কবিতার মধ্যে। তাদের অস্ত্রের মহড়া সে দেখেছিল আরও বড় হয়ে। যখন পরিপূর্ণ বড় হল-নিজস্ব সাহিত্য, চিত্রকলা, রীতির পথ বেয়ে স্বাদ নিল পশ্চিমের, দক্ষিণের; নিজের দেশ থেকে আরও পূবের শিল্প-সাহিত্যের-রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর জয়নুলকে পুঁজি করে মার্কেজ, শেঙ্পিয়ার আর পিকাসোর নৈর্ব্যক্তিক জগতে। জানল, এ-সবকিছু এক করলে সুন্দর-অপরূপ এক ক্ষেত্রে বিচরণ করা যায়। জয়তীর সঙ্গে এসব নিয়ে তার রাতের পর রাত আলাপ হয়েছে। জয়তীও বলেছে, শুনেছেও। দ্বিমত করেছে, কিন্তু কখনো কোনোকিছুর বিরোধিতা করেনি। শুভ তার নিজের মতো করে গড়ে নেওয়া বৈশ্বিক আচরণ জয়তীর উপর অবলীলায় চাপিয়ে দিয়েছে। জয়তী কিন্তু শুভর মনোজগতের একটা ব্যাপারে কখনো সায় দেয়নি। ভালোবাসার খাতিরে মেনে নিয়েছে শুধু।

শুভ বিয়ের আগে জয়তীকে রাজি করেছিল ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে তারা বিয়ে করবে। ভ্যালেন্টাইস ডের একদিন পর। তারপরের বছরগুলোতে যখন তারা তাদের মিলনের বার্ষিকীকে স্মরণ করবে, শুরু করবে ১৩ তারিখে। ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে পয়লা ফাল্গুন। সেদিন বাংলাদেশের জলে-স্থলে, অন্তরীক্ষে উজ্জ্বলতার মাতন লাগে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষগুলোও তাদের ‘কনকনে’ বেশ ছেড়ে আলোর মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেদিন ফুলগুলোও হয়ে যায় আরও উজ্জ্বল। যারা এই উজ্জ্বলতা বরণ করতে পারে না, ভাবে, ‘একি করলাম!’

শুভ চায় এমনদিনে তাদের দুজনের সম্পর্কের উজ্জ্বলতাকে উস্কে দিতে। স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করবে দিনটি। সারাদিন সে জয়তীকে বলবে-দেখি তো কতটা সাহসী হতে পার; আমি তোমার হৃদয়ে যাব; পথ ছাড়।

জয়তী যখন পথ ছাড়বে তখন ফাল্গুনের প্রথম দিন পেরিয়ে দ্বিতীয়টিতে পড়বে। ফেব্রুয়ারির ১৪। ভ্যালেন্টাইন্স্ ডে।
এই ভ্যালেন্টাইন্স্ ডেতে শুভ জয়তীর ছেড়ে দেওয়া পথ পেরিয়ে তার কাছে যেতে চাইত… ছুঁতে চাইত, উন্মত্ত হতে চাইত, পাগলামি করতে চাইত। সারাদিন…। দিন পেরিয়ে রাত। রাত পেরিয়ে যাবার মুহূর্তগুলোকে মনে হবে কোনো সংগীতের শেষের স্তবক। যখন তবলার আওয়াজ বেড়ে যায়, তবলচীর হাত চোখে পড়ে না, হারমোনিয়ামের শ্বাস-প্রশ্বাসও দ্রুত হয়। ১৫ তারিখ যখন হবে, তবলচী তখন তার শেষ শব্দটি করবে।
তারপর ভাললাগার পালা। নিস্তব্ধ থাকবে সারাদিন। ভাললাগা যেন রন্ধ্রে-রন্ধ্রে অনুভব করবে। পেরিয়ে যাবে অনেক সময়। যতক্ষণ ক্ষুধা না লাগে। তারপর ক্ষুধার্ত দুজন বেড়িয়ে পড়বে কোনো এক প্রান্তরে। তখনও কিছু ক্ষেত কাঁচা ছোলায় বেঁচে আছে আহরণের অপেক্ষায়! তখন মাথার উপর আকাশ নেই। জমিনে আছে পাথর ঠুকে ধরানো আগুন। সেই আগুনে ছোলা সেদ্ধ হবে। ক্ষুধার্ত দুজন জলের পরশ পাবে, স্বপ্নের মতো এক পৃথিবীতে!
কিছু বছর তাদের এমনটাই কাটছিল। আনন্দে। তারপর কিছু পরিবর্তন চারদিকের সবাইকে চমকে দিল। আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন ঘটলো। এমন এক ঘটনা, যা পুরো পৃথিবীকে সারাজীবনের জন্য বদলে দিলো। বদলে দিলো মানুষগুলোকে; তাদের চিন্তা-চেতনাকে। একেকজন মানুষ হয়ে গেল একেকটি অচেনা দ্বীপ। দেশে দেশে জাতিগত দূরত্ব বাড়তে লাগল। কিছু দেশের সরকার সন্ত্রাসবাদ থামানোর নামে ধর্ম নিয়ে মাতল। বিশ্বায়ন কিছু দেশের মানুষের মধ্যে অপ্রিয় হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াল। বাংলাদেশের অগণিত মানুষের কাছে বিশ্বায়ন বিষাক্ত বাতাসের মতো লাগল।
জয়তীও তাদের একজন। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি সব ব্যাপারেই সে বিশ্ব থেকে-পশ্চিম থেকে, পূবের কাছ থেকে দূরে সরে এসে বাংলা আর বাঙালিত্বের মাঝে আশ্রয় নিল। তার জীবনের সঙ্গে বাঙালিত্ব এতটাই নিবিড় করে নিল যে বাঙালির কাছে গণ্ডারের মতো তেড়ে আসা বৈশ্বিক সংস্কৃতি, পশ্চিমা রীতিনীতির বিরুদ্ধে তার মনে একটা ক্ষোভের সঞ্চার হল। আর জয়তীর ক্ষোভটা যে ঘৃণায় রূপ নিচ্ছিল, তা শুভ টের পাচ্ছিল।
কয়েক বছর আগেও যা আশা করেনি শুভ, তাই ঘটল। জয়তীর আক্রমণটা আসলো ভ্যালেন্টাইন্স্ ডের ওপর। তার জীবনসঙ্গীনী দাবি করে বসল, তাদের জীবন থেকে ওই দিনটি উদ্যাপন বাদ দিতে হবে। এ কথাটি সে শুভকে জানাল তাদের মিলন-বার্ষিকীর ঠিক কয়েক দিন আগে। ১০ তারিখে।
-শোন, এখন থেকে আমরা আমাদের ১৫ তারিখ ১৫ তারিখেই পালন করব।

জয়তী কথাটা বলল, তার মুখের কাছে মুখ এনে। কিন্তু কণ্ঠে তার গাম্ভীর্য টের পেল শুভ। কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে কারণ জানতে চাওয়ার আগেই জয়তী আবার বলল, একটা অত্যাচারী জাতির সংস্কৃতিতে আমি আর অংশ নিতে পারব না। তুমি আমাদের তিনদিনকে একদিনে গুটিয়ে আন।
গুটিয়ে আনার চেয়ে শুভর খটকা লাগল তার সবচেয়ে কাছের মানুষটির একপেশে অবস্থান। ভাল করে তাকাল তার দিকে। বোঝার চেষ্টা করল। ভাবল, জঙ্গিবাদ অবশেষে আছর করল না তো? কথা বলার জন্য মুখ নাড়তেই জয়তীর কণ্ঠে দৃঢ়তা — না; সংস্কৃতি নিয়ে তোমার লম্বা ফিরিস্তি এখন শুনতে চাই না। তোমার ইচ্ছে হয়, ওই ইংরেজি দিনটা তুমি একা পালন কর-গে যাও।

শুভ বুঝল এখন বেশি কথা বলা ঠিক হবে না। কাল বুঝিয়ে বলবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার মধ্যে একটা আড়ষ্ঠতা ভর করল। সে রাতে জয়তীর সঙ্গে আর কথা হল না। ছোঁয়া হল না। জয়তী বোধহয় তার আড়ষ্ঠতা টের পেল। সে আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলল না। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।

অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না শুভ। এতকাল তার ভালবাসায় স্নান করিয়েছে জয়তীকে কিন্তু একটা আদর্শগত যুদ্ধের কাছাকাছি চলে আসবে তা উপলব্ধি করার সামর্থ্য তার হয়নি। নিজের বুদ্ধিকে ধিক্কার দিলো শুভ। তার ভালবাসার কোথাও কোনো দূরত্ব ছিল হয়ত! যোগাযোগ ঠিকমতো হয়নি। সে জয়তীকে ঠিক বোঝেনি। হয়ত বুঝতে চায়ওনি। শুধু নিজেকে বুঝিয়েছে।

পরদিন এ নিয়ে আর কোনো কথা হল না। আড়ষ্ঠতা রয়েই গেল। সকালে বিছানা ছাড়ল। নাস্তা করল একসঙ্গে। কিন্তু কথা হল না। যেন একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ।

সারাদিন মনের মধ্যে কি যেন একটা খচ্খচ্ করল। নাহ! যুদ্ধ শেষ করতে হবে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখল, জয়তীও ফিরেছে এই মাত্র। স্নানে যাবার পোশাকে নিজেকে গলিয়ে দিয়েছে। কাছে গিয়ে আলতো করে জয়তীর ঠোঁটের উপর চুমু দিল। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসল। খাবার টেবিলে অনেক কথা হল। কাজের কথা, অকাজের কথা। খাওয়া সেরে দুজনে খবরের সামনে বসল, ভাল লাগল না। জয়তী ‘বিফোর সানসেট’ নামে একটা সিনেমা চড়িয়ে দিলো। সিনেমাটা খুবই ভাল লাগল দুজনের। শেষ হতে না হতেই দু-জন দু-জনকে খুব কাছাকাছি আবিষ্কার করল। যেন দুটো প্রজাপতি একটা ফুলের চারিধারে ঘুরে ঘুরে মধু চাখ্ছে; আর তাদের ঘিরে একটা নির্মল আলো, অপ্রাকৃতিক শব্দ!

শুভ ভেবেছিল, গতকালের বিবাদের ইতি হবে শৃঙ্গারের মধ্য দিয়ে। অস্ফুট কয়েকটি কথা হল। কিন্তু সে কথা একেবারেই হল না। যেন দুজনেই প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইছে।

বুঝল যুদ্ধটা এখনও শেষ হয়নি।

ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। সব কথাই হচ্ছে, শুধু একটি কথাই হচ্ছে না। শুভ ভেতরে ভেতরে একটা অদম্য রাগ অনুভব করল।
১৩ তারিখে কেউ কারো খোঁজ নিলো না, নিয়মমাফিক দুজনে দুজনের কাজে গেল। ফিরল। গতানুগতিক আনুষঙ্গিকতা। পরদিন তাদের মধ্যে যোগাযোগ সংকীর্ণ হয়ে এলো। বুঝতে চেষ্টা করল জয়তী কি চিন্তা করছে। সে নিজে যেভাবে রাগছে, কষ্ট পাচ্ছে; জয়তীর অনুভূতিও ঠিক একই কি-না। জয়তীর চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে সে রেগে নেই কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে।

রাত বারোটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। শুভর এখনই কিছু করা দরকার, জয়তীইবা কিছু বলছে না কেন। কোনোদিন সে এরকম ভয়ংকর পরিস্থিতির সামনে দাঁড়ায়নি। সে নিজেও বা কেন জয়তীকে কাছে টেনে নিচ্ছে না। কি হচ্ছে তাদের সম্পর্কের? কোথায় যাচ্ছে?

বারোটা পেরিয়ে গেল। দূরত্ব এতটুকু কমলো না। দুজন সটান হয়ে পাশাপাশি শুয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। দুজন একে অপরকে আড়চোখে দেখছে কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না। নিস্তব্ধতায় মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর বাতাস নেই।

১৪ তারিখে সারাদিনটা খুব খারাপ গেল শুভর। চোখটা ফোলা, চুল এলোমেলো, কিছুই করছে না। শুধু টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুই খায়নি, তাই শরীরে শক্তি পাচ্ছে না। চেয়ারে মাথা এলিয়ে ঘুমিয়েও পড়েছিল। তারপরও খেতে ইচ্ছে করল না। ভেতরের রাগ আর ভয় চেপে রাখতে গিয়ে দুর্বল-বোধ হলো। সেকেন্ড আর মিনিট গুণতে গুণতে সময়টা পার করল। তারপর বেরিয়ে পড়ল। জানে না এরপর কি ঘটতে যাচ্ছে। শুধু জানে আজকের দিনটা পেরুলেই ১৫ তারিখ।

হালিম চাচার বাড়ির গলি পার করে এসে দাঁড়াল তার ভালোবাসার দুয়ারে। মূল ফটকে গাড়ি দাঁড় করিয়ে উপরে তাকাল। বুকটা কেঁপে উঠল। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু তাদের ঘরে কোনো আলো জ্বলছে না। তাহলে? গাড়ি বারান্দা পার হয়ে গ্যারেজের দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ি ঠিকমতো রাখার জন্য যে মনোযোগ দরকার আজ মনে হচ্ছে সেটি তার নেই। কোনোমতে গাড়ি রেখে সঙ্গে আনা জিনিসপত্র না নিয়েই দোতলার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

পা-দুটো ভারি লাগছে। কোনোমতে টেনে তুলে এক-এক করে সিঁড়িগুলো পেরুলো। দোতলার দরজা খোলাই ছিল। তার নিজের ঘরের দুয়ার আলতো করে ভেজানো। ঠেলে ঘরে ঢুকতেই দরজাটা আজকে বরাবরের মতো কঁ্যাচ কঁ্যাচ শব্দ করলো না। কব্জাগুলোতে তেল দিয়েছে কেউ। ঘরের ভেতরটা ঠাণ্ডা। মৃদু শব্দে এয়ারকুলার চলছে। পুরো ঘর অন্ধকার। শুধু জয়তীর সাজ-টেবিলের বাতিটা গোধুলীর মতো জ্বলছে। তারপরও শুভর কাছে মনে হল তাদের ঘরটা আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আছে।

জয়তী বসে আছে তার সাজ টেবিলের তিন-কোণা আয়নার দিকে মুখ করে। পরনে সাদা-কালো শিফনের শাড়ি। শুধুই শাড়ি, আর কিছু নেই। চিরুনিটা সোজা চুলের মধ্যে গাঁথা। শুভ নড়াচড়া করতে ভুলে গেল। জয়তীর উজ্জ্বল বাদামি রঙের মুখটা সে আয়নায় দেখতে পাচ্ছে। কপালে মন্দিরের চূড়ার মতো কালো একটা টিপ পরেছে জয়তী। সবকিছু বাদ দিয়ে জয়তীর শুধু শাড়ি পরার অর্থ শুভ জানে। এটা জয়তীর একটা যাদু-যা শুভর মধ্যে মন্ত্রের মতো কাজ করে।

অদ্ভূত ব্যাপার ঘটতে শুরু করল।

বুকের মধ্যে ভর করে থাকা পাথরগুলো একটা একটা করে সরে যেতে থাকল। সারাদিন শরীরে যে ম্যাজমেজে ভাব ছিল তা হঠাৎ করে নেই হয়ে গেল। নিজেকে হাল্কা লাগতে শুরু হল। দিগ্বিজয়ীর মতো মনে হল। এই মুহূর্তটাকে তো পালিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। মনে রাখার মতো কিছু একটা করতেই হবে।

তাদের ঘরের কোণে অনেকদিনের পুরনো একটা গ্রামোফোন আছে। এখন আর খুব একটা শোনা হয় না। শুভ বেছে রেকর্ড বের করল। চড়িয়ে দিয়ে জয়তীর পেছনে এসে দাঁড়াল। আয়নার মধ্যে তাদের চোখাচোখি হল। জয়তীর এক কাঁধে শাড়ির আঁচল, আরেকটি নগ্ন। শুভ তার উদোম কাঁধে হাত রাখল। জয়তী কেঁপে উঠল। তারপরই সে শরীটাকে সাপের মতো বাঁকিয়ে, ঘুরে উঠে দাঁড়ল শুভর মুখোমুখী। প্রায় মিনিট খানেক দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। জয়তীর তাকিয়ে থাকা শুভর কাছে এক তলাবিহীন সাগরের মতো মনে হল। ততক্ষণে গ্রামোফোনে গীটারের মূর্ছনা শুরু হয়ে গেছে।

হাত বাড়িয়ে শুভ বলল, ‘শ্যাল উই ডান্স?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

Why do we keep waiting for the next disaster?

Five patients died at a five-star hospital when a makeshift ward caught fire on Wednesday …