ছবিঃ গুগল...

সামাজিক হয়রানি

সামাজিকভাবে মানুষকে হয়রানি করা হলে তার আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। আমরা মানুষ হিসেবে জন্ম নিতে পেরে অনেক গর্বিত, কিন্তু অন্য আরেকজন মানুষকে হয়রানি করতে আমাদের বাধে না। যে যেমনভাবে পারছি অন্য মানুষদের হয়রানি করছি। আর মানুষগুলো যদি নারী হয়, তাহলে হয়রানির মাত্রা আরো বেড়ে যায়।

খবরে বেরিয়েছে, আমাদের দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে ২২ শতাংশ নারী শ্রমিক যৌন হয়রানির শিকার। কারা তাদের হয়রানি করেন? তাদের সুপারভাইজাররা। শুধু সুপারভাইজাররাই ৮৬ শতাংশ নারী শ্রমিককে যৌন হয়রানি করেন। এই নারীরা বলছেন, তাদের কাজের স্থানে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো অকার্যকর। আর ১১ শতাংশ নারী শ্রমিকই মনে করেন, তারা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীন। ২৭ শে আগস্ট ঢাকায় এক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

সেমিনারে বলা হয়েছে, এসব কারখানায় নারীদের কাজের পরিবেশ হয়রানিমুক্ত করতে সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। সচেতনতা তৈরি করার কথা অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে, কিন্তু তেমন কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পুরুষরা নারীদের হয়রানি করেই চলেছেন। সচেতনতা তৈরি ছাড়া আর কিছু করণীয় আছে কি না তা নিয়ে আমরা কতটুকু ভাবছি? যারা এই কারখানাগুলোর মালিক তারা কি করছেন?

পোষাক কারখানা স্থাপন করে বিদেশে পোশাক রপ্তানি করে শুধু অর্থ রোজগার করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এসব কারখানার ব্যবস্থাপনা পর্ষদগুলো যদি নিজ-নিজ কারখানার জন্য অভ্যন্তরীণ আইন তৈরি করে হয়রানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেন- তাহলে অবস্থার পরিবর্তন আশা করা ভুল হবে।

শুধু এই কারখানাগুলোতে নয়, হয়রানির ক্ষেত্র আরো আছে। বাসে ও রেলগাড়িতে মেয়েদের হয়রানির কথা বাদই দিলাম। তবে অনেকদিন ধরেই সামাজিক (গণ) মাধ্যমে বা অনলাইনে নারীদের নানাভাবে হয়রানি হওয়ার কথা অনেকদিন ধরে বলা হচ্ছে, কিন্তু অবস্থার তেমন উন্নতি আমরা দেখিনি। বাংলাদেশের অনলাইন ব্যবহারকারী ৭০ শতাংশ নারীই কোনো না কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যদিও বিশ্বজুড়েই এমন ঘটনা বাড়ছে, তবুও আমাদের দেশে এমন ঘটনা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।

এই বিষয়টি বিশ্বব্যাপী অনলাইন কোম্পানিদের বেশ চিন্তিত করে তুলেছে। ফেসবুক এবং গুগলের নীতি-নির্ধারকরা ব্যবহারকারীর পরিচয়, তথ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। ফেসবুকে ইতিমধ্যেই দেখা গেছে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নতুন অনেক কিছু যোগ করতে। তবে আমরা নিজেরা এ বিষয়টি নিয়ে কী করতে পারি তা ভেবে দেখার বোধহয় সময় এসেছে।

একজন নারী যেন অনলাইনে হয়রানির শিকার না হন তা আমরা জাতিগতভাবে কেমন করে নিশ্চিত করবো তা নিয়ে কতটুকু চিন্তা-ভাবনা করেছি? এই যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি করা হলে অভিযুক্তের ৭ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সবার জন্যই একই আইন, একইভাবে প্রযোজ্য। এমন কঠিন আইন থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ হচ্ছে না এবং সে সুবাদে ফেসবুকসহ সব সামাজিক মাধ্যম অপব্যবহার করে ব্যক্তিপর্যায়ে হয়রানি আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শুধু ভার্চুয়াল জীবনেই নয়, বাস্তবেও হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারীরা। হয়তো কিছু আইন হয়েছে বা আরো হবে। কিন্তু আমাদের নারীদেরকে সচেতন করার ব্যাপারে আমরা কতদূর অগ্রসর হয়েছি তা ভাবার সময় হয়েছে।

শুধু আইন করে হয়তো ফল পাওয়া যাবে না। আবার, শুধু সচেতনতা বাড়িয়েও ফল পাওয়া যাবে না। হয়রানি একটি জাতীয় চরিত্রগত বিষয়, সংস্কৃতিতে লেপ্টে আছে। এটি বদলাতে হলে সংস্কৃতিগতভাবেই বদলাতে হবে এবং তেমন করেই কৌশলপত্র তৈরি করতে হবে।

প্রথম প্রকাশ বার্তা২৪’এঃ- https://barta24.com/details/যুক্তিতর্ক/9921/সামাজিক-হয়রানি

Leave a Reply

Your email address will not be published.