স্যার এসএম আলী

সবাই ডাকেন ‘আলী ভাই’ আর আমি ও আমার কয়েক বন্ধু [বন্ধু মানে প্লেইটো আর আশিষ] মিলে তাঁকে ‘এসএম আলী স্যার’ বলি। কেউ বলে দেয়নি। আমাদেরই মনে হয়েছিল তাঁকে ‘স্যার’ বলে ডাকা যায়। সাংবাদিক মহলে এই একজন মানুষকেই ‘স্যার’ বলে সম্বধন করতে নিজের মন থেকে এক তাগিদ অনুভব করেছিলাম আমরা।
এসএম আলী স্যারই আমার জানা-পরিচয়-কাজের প্রথম সম্পাদক। সম্পাদকের মত সম্পাদক। ঠিক যেন এক উপন্যাসের গল্প থেকে আবির্ভূত। তখন তেমনটা বুঝিনি। মনে করেছিলাম তরুণ জীবনের নব্য আকর্ষন। এখন বুঝি আকর্ষনটি কেমন ছিল।
তাঁকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে। একটা বলি।
‘দ্য ডেইলী স্টার’-এ কাজ শুরু করার প্রথম সাতদিনের মাথায় মদন শাহু আমার হাতে পূরো সম্পাদকীয় পাতার দায়ীত্ব দিয়ে তাঁর শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটিতে গেলেন। আসলে উপসম্পাদকীয়। তিনটে সম্পাদকীয় প্রতিদিন ছাপা হতো তখন। সেদিন একটি লিখবেন ওয়াহিদুল হক, একটি সাবির মুস্তাফা আর একটি নীলরতন হালদার।
মদন’দা ছাপানো ডামি-কাগজে একটা নক্সাও এঁকে দিয়ে গেলেন।
উপসম্পাদকীয় ছাপা হবে তিনটে। তার দু’টিই মদন’দা তৈরী করে রেখে গেছেন। আরেকটি লেখা আসবে, মদন’দার ভাষায়, আলী ভাইয়ের কাছ থেকে। “অ্যাট্ হোম অ্যান্ড অ্যাব্রড্”। মদন’দা বুঝিয়ে গেলেন ছয় কলামে তিন ভাগ করে ট্রেসিং বের করতে হবে। তিনি বলনেন, ‘আলী ভাই টাইপ করেন; কোন ভুল থাকে না। মুন্না, তুমি কম্পোজ করিয়ে, কম্পিউটরে প্রিন্ট-আউট নিয়ে, খুব ভাল করে মিলিয়ে দেখে, তারপর ট্রেসিং নিয়ে পেস্টিং করে দেবে। পেস্টাররা তোমাকে সাহায্য করবে; আর অন্যগুলোর ছবিতো এঁকেই দিলাম। ডোন্ট ওয়ারী। ইউ’ল বি ফাইন; কিছু দরকার হলে মাশুক সাহেবকে জিজ্ঞেস করবে।‘
এসএম আলী স্যার আপিশে আসেন এগারোটার সময়। আমিও তাই। সেই শনিবারে পৌঁছে দেখি তিনি লেখা কম্পোজে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার আগে এসেছেন। লেখা কম্পোজ হয়ে এলে মিলিয়ে দেখছি। সম্পাদনার কিছুই বুঝি না। শুধু মিলিয়ে দেখি। মদন শাহু, মাশুকুল হক যা বলেন – তাইই করি।
এমন সুন্দর হালকা-হলদে কাগজে এমন ঝকঝকে টাইপ করা পাতা আমি জীবনে আর দেখিনি।
টাইপ করা দু’পাতা। প্রথম পাতার মাঝামাঝি এসে দেখি একটি শব্দের নীচে কলম দিয়ে দাগ দিয়ে, লাইন বরাবর সেই দাগ বাঁদিকে টেনে নিয়ে মার্জিনে উপর-নীচ দাগ দিয়ে ‘ইটালীক’ শব্দটি লেখা।
যতটুকু সম্পাদনা তখন শিখেছি, সেই জ্ঞানেই কম্পিউটর প্রিন্ট-আউটের ওপর কলম দিয়ে লিখে দিলাম – ‘ইটালীক’।
পরদিন সকালে পত্রিকা বেরুলো। “অ্যাট্ হোম অ্যান্ড অ্যাব্রড্” ছাপা হলো। আমিও আপিশে আসলাম। স্যারও এলেন।
কিছুক্ষণ পর শুনি তিনি আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন।
তাঁর ঘরে ঢোঁকার আগে ইংরেজি ভাষায় জানতে চাইলাম, ‘স্যার আসবো?‘
তিনিও ইংরেজিতে আহবান করলেন, এসো, এসো; বসো।‘
‘তুমি এটা কি করেছো! শুধু একটা শব্দ ইটালীক-এ হবে; তুমি পুরোটাই ইটালীকে ছাপিয়ে দিয়েছো!’
আমি কিছু বলতে পারছি না! আমি হাঁ! হাঁ! হাঁ! তিনি আমার সমস্যা বুঝলেন। বললেন, ‘যাও – কয়েকটা কপি নিয়ে এসো; হাতে লেখা কপি, টাইপ করা কপি আর কম্পিউটার কম্পোজ করা কপি।‘
সব নিয়ে এলাম।
তিনি আধঘন্টা আমায় তাঁর পাশে বসিয়ে প্রাইভেট টিউটরের মত সম্পাদনা শেখালেন।
পরদিন মদন’দাকে সব বললাম। শাহু’দা মুচকি হেসে বললেন, ‘মুন্না, কাজ করো’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *