Photo: Google

বনশ্রীর শোয়ার ঘরের সাথে লাগোয়া ঝুলবারান্দা। সেখান থেকে নীচে ও কিছুদূর তাকালে শহুরে হ্রদের জল দেখা যায়। জলের দিকে তাকিয়ে একসময় সে প্রহরের পর প্রহর পার করে দিয়েছে। একসময় তা দেখতে তার কাছে স্বর্গীয় উদ্যানের মত মনে হতো। এখন তা একটি কুপের মত লাগছে। চন্দ্রালোকে যেই পদ্মগুলো এক সময় জল-জল চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতো, সেগুলোই এখন জল-বিছুটির মত হুল খাড়া করে তাকে খাবলে ধরবে বলে মনে হচ্ছে। সে বারান্দায় এসে বসলেই গোলাপী-বেগুনী ফুলগুলো চাঁদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তার পানে চাইতো। চাঁদ উঠলেই ওরা চাপা-সোনা রঙের আভা গায়ে পরতো। তারই ফাঁকে-ফাঁকে মাছগুলো সন্ধ্যানিদ্রা ছেড়ে কোমর দুলিয়ে ডুব-সাঁতার দিতো। তারা জলের গভীরে যাত্রা করলেই পাতা ও ফুলের চারপাশে তরুণাভ ঢেউয়ের বৃত্তরাশি তৈরী হয়ে চন্দ্রালোকে যাত্রা শুরু করতো। পদ্মফুলের চোখ আছে কিনা সে জানতো না, সেই চোখ ছল-ছল করে কিনা তাও সে জানতো না। পদ্মফুল চাঁদের দিকে চেয়ে থাকে কিনা সে জানতো না, তার নীচে মাছ সন্ধ্যা-নিদ্রা যায় কিনা সে জানতো না। সেখানে কোন বিছুটি আছে কিনা সে জানতো না, সেই বিছুটি হুল ফোটাতে পারে কিনা তাও সে জানতো না, পদ্মপাতার হুল হয় কিনা তাও সে জানতো না। এই দৃশ্যগুলো বনশ্রীর মনে ভাসতো, কল্পনায় উদয় হতো। এমন অনেক উদ্ভাসিত সন্ধ্যা সে পার করেছে এই অল্প কয়েক বছরের ভালবাসাবাসির জীবনে। শুধু জানতো তার জীবন অনেক সুন্দর; ঠিক যেমনটি সে চেয়েছিল। প্রান্তিক বনশ্রীকে এমনই ভালবেসেছিল যে জীবনের সুখগুলো সুখের চেয়েও বেশি মনে হতো। প্রান্তিক বেঁচে থাকতে কোন দুঃখের কথা সে মনে করতে পারে না। জাগতিক কিছু না-পাওয়া রয়ে গেলেও তা বনশ্রী অনুভব করে নি। তবে কোথা থেকে যেন একটি আচমকা বাতাস এসে তার সুখগুলো উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আকাশের কোন এক প্রান্তে আছড়ে ফেলেছে। নীলাকাশ এখন তার কাছে শুধুই কালো চাদরে ঢাঁকা এক অপ্রিয় প্রান্তর। সে দিকে এখন আর সে তাকাতে চায় না। ঝুলবারান্দার নীচে হ্রদের জল তার কাছে এখন মৃত্যুকুপ।

নাহ, কেন প্রান্তিকের স্মৃতিতে আবারও ভাসছে সে? চায় না সে; চায় না। স্মৃতিগুলো স্বাভাবিক নয়। প্রান্তিক বেঁচে থাকতেও তাদের জীবন স্বাভাবিক ছিল বলে তার কাছে এখন মনে হয় না। সে চলে যাওয়ার পরও তা আরও অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। একজন মানুষের জীবনে এমন সুখ স্বাভাবিক হতেই পারে না। এই সত্য তার কাছে আগে কখনও ঠাহর হয় নি। তবে কি তাদের সুখে ফাঁক ছিল? গলদ ছিল? খুব বেশি সত্য আসলে যেমন সত্য নয়, বেশি সুখও তেমনি সুখ নয়।

আবারও ভাবছে সে প্রান্তিকের কথা।

আজ চন্দনের সাথে দেখা হওয়ার কথা ছিল। অমোঘ অভিলাষ থাকা সত্তেও বনশ্রী দেখা করতে যায় নি। সাধের সাথে যুদ্ধ করেছে। ভেবেছিল চন্দন শহরান্তের এক রেস্তোরাঁয় এসে দেখা করার কথা বলবে। বনশ্রী তার সাথে লুকিয়েই দেখা করতে চায়। তবে চন্দনের ভাবনা ছিল একেবারে অন্যরকম। সে চাইলো তাদের দেখা হবে শহরের প্রাণকেন্দ্রে – যেখানে শহরের আকাশ থেকে মাটি বরাবর একটি লম্ব আঁকলে সেটি যেখানে প্রবেশ করে, ঠিক সেখানে। সেখান থেকে ওপরে গেলে ঘন মেঘের রাজ্য। রাজি হয় নি বনশ্রী। কিছুদিন চন্দনকে বোঝবার প্রয়োজন ছিল। চন্দনের বাড়ানো হাতের মত এমন অনেক দেখেছে সে। সবার ধারণা হয়েছিল হাত বাড়ালেই বনশ্রী সম্মতি দেবে। সে সব হাতগুলোতে বিশ্বাস ছিল না; মানত ছিল না। স্বামীহীন একটি মেয়ের দিকে হাতগুলো যে এমনি-এমনিই উঠে আসে সে তা জানে। কোথা থেকে যেন ঐ হাতগুলো সামলানোর জ্ঞান তার হয়েছিল। কেমন করে হয়েছিল সে জানে না। চন্দনকে অন্যরকম মনে হয়েছে। তার কোন তাড়া নেই। বটের ছায়ার মত, তবে শাঁড়াশির মত নয়। চন্দন আপিস শেষে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার ভানও করে নি। অন্যদের সেই ভনিতা সে নীরবে দেখেছে। সব নাটকের পর্দা পড়লে, চন্দন বনশ্রীকে বলেছে সে তাকে আরও জানতে চায়। একথা আর কেউ তাকে বলে নি। সবাই তাকে মুক্ত করতে চেয়েছে, চন্দন চায় নি। তার বন্দিত্বে সেও বন্দি হতে চেয়েছে। এমন মানুষের উৎসাহে যবনিকা টানতে বনশ্রী পারে নি। আত্মবিশ্বাসী এক নিশ্চিৎ আশ্রয়াস্থল বুঝে সে নিজের হাত তার হাতের মাঝে গুঁজে দিয়ে দেখেছে সেই হাত নিতান্তই হাত নয় – পুরো মানস দিয়ে তাকে জাপটে তোলার ইচ্ছা।

চন্দনের সাথে দেখা হয়েছে মাস ছয়েক হয়। বনশ্রীর আপিসের সহকর্মী। বেশ কয়েক মাসের চেনাশোনা। তবে চেনা-জানা নয়। জেনেছে ধীরে ধীরে। সময় লেগেছে। প্রান্তিক চলে যাওয়ার প্রায় দু’বছর পেরিয়ে গেছে। তার চিন্তায়ই মগ্ন থেকেছে বনশ্রী। মৃত স্বামীর জন্য মগ্নতা তাকে সুখ দিয়েছে; কষ্টও দিয়েছে। তবে মগ্নতা কষ্টকে ঢেঁকে দিয়েছে। একা হয়েও হয় নি সে। সবাই তাকে মর্মবানী শুনিয়েছেন; বলেছেন সে যেন প্রান্তিক চলে যাওয়ার কষ্ট ধীরে-ধীরে মন থেকে মুছে ফেলে। প্রান্তিকের বাবা-মা-ভাই-বোন তাদের সন্তান ও ভাইয়ের জন্য কেঁদেছেন। তার কান্না থামাতে কেউ আসেন নি, পারেও নি।

চন্দন শুধু তার দিকে হাত বাড়ায় নি। কাঁধ হেলিয়ে দিয়েছে; তার কাঁধে মাথা রাখতে দিতে চেয়েছে। শক্ত করে ধরে মেঘের রাজ্যে নিয়ে গিয়ে সব ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। প্রথমে বিশ্বাসই হয় নি। একবার এক রেস্তোরাঁয় বাটি থেকে স্যুপ বাড়তে গিয়ে চন্দনের আঙ্গুল তার আঙ্গুলে ছুঁয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুতের চমক লেগেছিল সারা শরীরে, মনে। এ যেন নতুন এক নগ্নতা, নতুন এক মগ্নতা। কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নগ্ন করে দিয়েছিল। এমন এক নগ্নতা যার জন্যে ভাললাগা আছে, ভালবাসা আছে। মনে-মনে সেই নগ্নতা-চুর্ণ মনে মেখে নতুন করে স্বপ্ন ওড়ানোর সাধ জেগেছিল বনশ্রীর। স্বপ্নকে কি ইচ্ছে করে, জোর করে ঠেকিয়ে রাখা যায়? থামিয়ে দেয়া যায়? নাকি স্বপ্নগুলো এমনি-এমনিই থেমে যায়? আবার জেগে ওঠে?

প্রান্তিককে আবারও মনে পড়ে। মৃত স্বামী একটি কন্যা-সন্তান বন্ধক রেখে গেছে। রুমকী তাদের সন্তান। নয় বছরে পড়েছে। মাঝে-মাঝে মনে হয়, চলেই যদি যাবে, তবে এই ভ্রুন উপহার দেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? মেয়েটির কি হবে? তবে রুমকী তো এখন সেই ভ্রুন নেই। ন’বছরে সে শিশু থেকে কন্যা হওয়ার যাবতীয় সামাজিক সংস্কার সে শিখে ফেলেছে। বনশ্রী শুনেছে কন্যারা নাকি বাবা’নেওটা হয়। সে নিজে বাবা’নেওটা ছিল কিনা তার মনে নেই। সুযোগই হয় নি। বাবাকে বাবা বলে জানতেই পারে নি। তাকে সে চোখেই দেখে নি। ছবি দেখেছে, গল্প শুনেছে। মা বলতেন বাবা নাকি যুদ্ধ করতে-করতে দশটি গুলি তাঁর শরীরে বেঁধার পরও নিজে তাঁর বন্দুকের শেষ গুলি ছুড়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছিলেন। স্বাধীন দেশের সমাজে বড় হয়েছে বনশ্রী, বাবা-হীন আবহাওয়ায়। বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ার তার কোন স্মৃতি নেই। বাবার কথা আজ তার খুব একটা মনে হয় না। মনে হয় মায়ের কথা। মা এতোকাল স্বামীহীন পরিবেশে নিজেকে সামলালেন কেমন করে? তাঁর জীবনে কি কোন চন্দন আসে নি? কেউ কি তাঁর আঙ্গুল ছুঁয়ে দেয় নি? নাকি যোদ্ধার বিধবা বলে রাষ্ট্রই তার কাছে কাউকে আসতে দেয় নি? যোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে মা অনেক সন্মান পেয়েছেন; স্বাধীনতার পার্বণ এলে সংবাদকর্মীরা বাড়িতে এসে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন এসেছে, নামী-দামী মানুষের কূর্নিশ দেখেছেন, ফুলের মালা পরা ছবি ছাপা হয়েছে। তারপরই আবার ফিরে এসেছেন নিজের জীবনের ঘানি ঠানতে। মা সব বুঝতেন। তিনি জানতেন, তিনি গণমাধ্যমের পণ্যে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁকে দেখাতে পারলেই মানুষ খবরের কাগজ পড়বে, টেলিভিশন দেখবে। তিনি বুঝতেন। আড়ম্বর মেনে নিতেন। তাঁর সন্মান তো তাঁর স্বামীরই সন্মান। দেখে ভাল লাগতো যে সবাই তাঁর যোদ্ধা-স্বামীকে মনে রেখেছেন।

এমন মায়ের মেয়ে হয়ে বনশ্রীও সব মেনে নিলেই পারে। মৃত প্রান্তিকের ছবি বুকে টাঙ্গিয়ে সারা জীবনটা কাটিয়ে দিলেই হয়। সুখতো পেয়েইছো, বনশ্রী; জীবনভর কি সবাই সুখে থাকে? শান্ত নদীতে ঝড় উঠলে নৌকো দুলতেই পারে। খুব অল্প দিনেই তুমি বেশী সুখ পেয়ে গেছো। নৌকো যে দুলতে পারে সেজন্যে তুমি তৈরী ছিলে না। বিপদের কথা তুমি একেবারেই ভাবো নি। চিন্তা কোরো না, বিপদে বসবাস করা অভ্যেস হয়ে যাবে। অশান্ত সাগরও একটু পরে আবারও শান্ত হয়। ইশ্বর মানুষের কাছে বিপদ পাঠিয়ে পরীক্ষা করেন। উত্তীর্ণ হলেই তিনি আবারও সুখ পাঠান। তোমাকে ভবিষ্যৎ সুখের জন্যে দুঃখকে বুকে জড়িয়ে রেখে কিছুক্ষণ কাটাতে হবে।

চন্দনের সাথে তেমন একটা বাইরে কোথাও সে যায় না। সম্ভব নয়। সমাজ দেখে ফেলবে। সমাজের চাউনি ভীষণ নষ্ট চাউনি। নষ্ট সেই দৃষ্টিতে দেখে ফেললে হাজারও কৈফিয়ৎ দিয়েও পুলসেরাত পার হতে পারবে না। সামাজিক মৃত্যু হবে তার – অবধারিত মৃত্যু। হয়তো সেও রাস্তা-ঘাটে পড়ে থাকতে পারে। প্রান্তিকের দেয়া সন্তানটিকে কেড়ে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হবে। একথা সবাই তাকে প্রান্তিক চলে যাওয়ার পর-পরই পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন। প্রান্তিকের বাবা-মা ও বড় ভাই বলে দিয়েছেন বনশ্রী এ বাড়িতে আমৃত্য থাকতে পারবে, তবে অন্য কাউকে ভালবাসলে, নতুন কারো সাথে ঘর বাঁধার ইচ্ছে হলে, কাউকে বিয়ে করলে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। একেবারে পরিস্কার; কোন লুকোচুরি নেই। এঁরা সত্যিই সৎ মানুষ; যা বোঝাতে চান, তা স্পষ্ট উচ্চারণ করে বলে দেন।

শহরের কোন বাড়িই আসলে বাড়ি নয়। ফ্ল্যাট। এক সময়কার দো’তলা আবাস ভেঙ্গে ছ’তলা করা হয়েছে যেখানে এখন দশ পরিবার বসবাস করে। দো’তলা বাড়িটি অবশ্য বনশ্রী দেখে নি। প্রান্তিক যখন এবাড়িতে তাকে টেনে এনেছিল, তখন তা ফ্ল্যাটে রুপান্তরিত হয়েছে। ফ্ল্যাট হলেও, মগ্নতায় তার এটিকে বাড়িই মনে হয়েছে। তার কোন ক্লান্তি ছিল না; ফ্ল্যাটে ক্লান্তি থাকে, বাড়িতে থাকে না। আবারও মায়ের কথা মনে হয়। মায়ের মনে স্বামী হারানোর ক্লান্তি ছিল, কিন্তু তার মানসে প্রান্তিকের অনুপস্থিতিতির ক্লান্তি আসে নি। প্রান্তিকের চলে যাওয়ার পর যখন ওর বাবা-মা-বড় ভাই সতর্ক করে দিয়েছিলেন, তখনও বনশ্রীর ক্লান্তি আসে নি। তারা’তো তাকে ভালবেসেই এ’বাড়িতে তাকে থাকতে দিয়েছেন। শুধু নতুন কোন ভালবাসার বিরুদ্ধে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। এ আর এমন কি। সে ভালবাসে প্রান্তিককে, তার স্বামীকে। স্বামীর স্মৃতি নিয়ে যদি তার নিজের মা জীবন পার করতে পারেন, বনশ্রীও পারবে। পেরেওছে সে। স্বামীর সাথে কাটানো প্রতিটি মূহুর্ত সে পূর্ন মনযোগে ভেবেছে। ভেবে হেসেছে, কেঁদেছে। কখনও কোন কিছুর অভাব বোধ করে নি। প্রান্তিকের অবর্তমানে, সে তার পরিবারের সাথে আরো বেশি মিশে গেছে। সংসারের খরচপাতির চিন্তে নেই। এঁরাই তাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ভালই চালাচ্ছেন। এতে তাদের কমতি নেই। তাকে বৌমা বলে এখনও অমরত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ একটাই। তাদের সিদ্ধান্ত সে মেনে নিয়েছে। নিজে থেকেই মেনেছে। প্রান্তিক ছাড়া সে আর কিছু ভাবতেও চায় নি। তাকে সুখী করার জন্য প্রান্তিকের আমরণ আপ্রাণ চেষ্টা ছিল। বনশ্রীকে সে সব দিতে চেয়েছে। এমন স্মৃতি নিয়ে তো বাকি জীবনটা অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যেতো। প্রান্তিককে ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা না করাই ছিল অনেক সুখের; বাস্তবসম্মত।

প্রান্তিক তাকে নিজের মত করে বাঁচতেও দিয়েছে – ঘরের বাইরে কাজ করতে দিয়েছে। তার একটি পরিচয় তৈরী করতে দিয়েছে; শুধু প্রান্তিকের বৌ হয়ে বেঁচে থাকার বাইরেও তাকাতে দিয়েছে। বনশ্রী তাইই ছিল, আপিস-সংক্রান্ত পরিচয় তার থাকা সত্বেও সে প্রান্তিকের বৌ’ই ছিল; ‘প্রান্তিকের বৌ’ বলেই সবাই তাকে ডেকে এসেছে; তা সে নিজেও চেয়েছে। তার মা যেমন ‘যোদ্ধার বৌ’ হিসেবে সারা জীবন কদর পেয়েছেন।

এদিকে চন্দন তার হাত বাড়িয়েছে বনশ্রীর বিধবা বৌ-রূপ ঘোঁচাতে; তাকে নতুন বৌ’এর পরিচয়ে সাজাতে। এই নতুন পরিচয়ের হাতছানি তাকে নাড়া দিয়েছে। আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় সূর্যের রঙ যেন কেমন বদলে গেছে। কেমন যেন চন্দনাভ। ঝুলবারান্দায় বসলে বাতাস এখন অন্যরকম মনে হয়। চন্দ্রালোকে পদ্মপাতা আরো গাঢ়ো সবুজ। সবকিছুতে একটি নতুন দ্যুতির আখ্যান সে খুঁজে পাচ্ছে। এমন অবস্থার সূচনা কি করে হলো একেবারেই বোঝে নি। অজান্তেই হয়েছে। আবারও ঘর বাঁধার স্বপ্ন কোথা থেকে এলো সে জানে না।

রুমকী বারান্দায় আসে; সন্তর্পনে; টের পায় না সে।

‘মা, কি করো? ক্ষিদে পেয়েছে।’

মেয়ের গলার শব্দে এক ধরণের সম্বিৎ ফিরে পায় সে। মর্তের অনুভব। একেবারে যেন প্রান্তিকের চেহারা পেয়েছে মেয়েটি। তার মেয়ে বলে মনেই হয় না। রুমকীর উপস্থিতি সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। চন্দনকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে এতোটাই ইকারাসের মত মোমের পাখায় ভর করে সুর্যের পানে ছুটছিল যে মেয়ের কথা ভুলেই গিয়েছিল। নতুন ঘরে মেয়েটির কি হবে? কে দেখবে তাকে? কার মেয়ে হয়ে সে বড় হবে? বনশ্রী এবাড়ি ছেড়ে গেলে মেয়েটিও আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে। নতুন কাউকে ভালবাসলে প্রান্তিকের ঠিকানায় বসবাস করার কথা আর ভাবা চলবে না। নতুন করে স্বপ্ন দেখলে তার মেয়ে ঠিকানাহীন হয়ে পড়বে। দ্বিধাহ্নিত স্বত্তায় ঝুলবারান্দার নীচের জলের রঙ আবারও বদলে যায়, পদ্মপাতা ও ফুলগুলো শিরিশ কাগজ দিয়ে ঘষা গুমোট চন্দ্রালোকে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যায়।

প্রথম প্রকাশঃ মাসিক গল্পকার, অক্টোবর ২০১৮।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

Immaturity dragging us down

There’s an interesting story about us Bengalis. God will not require any security guards i…